মঙ্গল গ্রহে মানুষের ভবিষ্যৎ অভিযানের প্রস্তুতি হিসেবে ৩৭৮ দিন ধরে কৃত্রিম পরিবেশে বিচ্ছিন্ন জীবন কাটানোর পর বাইরে এসেছেন নাসার চার সদস্যের একটি দল। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের হিউস্টনে নাসার জনসন স্পেস সেন্টারে পরিচালিত এই পরীক্ষামূলক অভিযানের লক্ষ্য ছিল, দীর্ঘ সময় পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় মহাকাশচারীরা কীভাবে দৈনন্দিন জীবন ও কাজ সামলান, তা পর্যবেক্ষণ করা।
শনিবার কৃত্রিম আবাসস্থল থেকে বেরিয়ে এসে দলের চিকিৎসা কর্মকর্তা এলেন এলিস বলেন, স্বেচ্ছায় বন্দিজীবন কাটানো কৃত্রিম মহাকাশচারীদের জন্য বছরটি ছিল অত্যন্ত কঠিন।
নাসার ‘ক্রু হেলথ অ্যান্ড পারফরম্যান্স এক্সপ্লোরেশন অ্যানালগ’ বা ‘চাপেয়া’ (CHAPEA) কর্মসূচির দ্বিতীয় অভিযানে অংশ নেন চার সদস্য। ২০২৫ সালের ১৯ অক্টোবর তাঁরা ১ হাজার ৭০০ বর্গফুট বা প্রায় ১৫৮ বর্গমিটারের একটি ত্রিমাত্রিক প্রযুক্তিতে তৈরি আবাসস্থলে প্রবেশ করেন। সেখানে টানা ৩৭৮ দিন বাইরের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন তাঁরা।
এই সময়ে কৃত্রিম মঙ্গলগ্রহের মাটিতে ফসল উৎপাদন, আবাসস্থলের রক্ষণাবেক্ষণ এবং নাসার কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের মতো বিভিন্ন কাজ করেন তাঁরা। পৃথিবী ও মঙ্গলের মধ্যকার দূরত্বের কারণে যোগাযোগে যে সময়ক্ষেপণ হতে পারে, তা অনুকরণ করতে তাঁদের বার্তা পাঠানো ও উত্তর পাওয়ার মধ্যে কৃত্রিম বিলম্ব রাখা হয়েছিল।
রোবটযান ও কক্ষপথে থাকা মহাকাশযানের মাধ্যমে মঙ্গল গ্রহ নিয়ে গবেষণা চালিয়ে আসছে নাসা। এবার ২০৩০-এর দশকেই সেখানে মানুষ পাঠানোর লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে সংস্থাটি। এর আগে ১৯৭২ সালের পর প্রথমবারের মতো মানুষকে আবার চাঁদে পাঠানোর পরিকল্পনাও রয়েছে তাদের।
এলেন এলিস বলেন, মহাকাশ গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব ধরে রাখার সুযোগ ক্রমেই সীমিত হয়ে আসছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের মহাকাশ কার্যক্রম পরিচালনায় বিশেষ প্রশিক্ষণকেন্দ্র এবং চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি বলেন, বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণার মাধ্যমে অর্থনীতির উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মহাকাশে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান সুদৃঢ় করতে এখনই উদ্যোগ নিতে হবে।
অভিযানটির অন্য তিন সদস্য হলেন দলনেতা রস এল্ডার, বিজ্ঞান কর্মকর্তা ম্যাথিউ মন্টগোমারি এবং ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার জেমস স্পাইসার।
আবাসস্থল থেকে বেরিয়ে এসে দলনেতা রস এল্ডার বলেন, মঙ্গল গ্রহে মানুষ পাঠানোর ঝুঁকি অনেক বেশি। তবে যথাযথ জ্ঞান, সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা, নেতৃত্ব, সৃজনশীলতা, দৃঢ় মনোবল ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। তাঁর মতে, মঙ্গলে মানুষ পাঠানো শুধু সম্ভবই নয়, একসময় তা বাস্তবায়িত হবেই।
অভিযান শেষে চার সদস্যের জন্য দুই সপ্তাহের মূল্যায়ন ও অভিজ্ঞতা পর্যালোচনার কর্মসূচি রাখা হয়েছে। নাসার বিজ্ঞানীরা তাঁদের কাছ থেকে দীর্ঘ সময় পৃথিবীর বাইরে থাকার সময় মহাকাশচারীদের দৈনন্দিন জীবন, কাজের চাপ ও শারীরিক-মানসিক সুস্থতা বজায় রাখার বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করবেন। একই সঙ্গে কীভাবে তাঁরা সীমিত সম্পদের মধ্যে সুস্থ, কর্মক্ষম ও একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে পারেন, তা জানার চেষ্টা করা হবে।
এটি নাসার দ্বিতীয় চাপেয়া অভিযান। এর আগে ২০২৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত চার সদস্যের আরেকটি দল একইভাবে জনসন স্পেস সেন্টারে ৩৭৮ দিন বিচ্ছিন্ন পরিবেশে অবস্থান করেছিল।
শনিবার দলটি বাইরে আসার পর তাদের স্বাগত জানান জনসন স্পেস সেন্টারের পরিচালক ভেনেসা ওয়াইচে। তিনি বলেন, সীমিত সম্পদ ব্যবহার করে নিজেদের আবাসস্থল পরিচালনা এবং মঙ্গল অভিযানের অনুকরণে বিভিন্ন কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন চার সদস্য।
পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগে কৃত্রিম বিলম্বের বিষয়টিও উল্লেখ করেন ওয়াইচে। তিনি বলেন, বার্তা পাঠানোর পর উত্তর পেতে দেরি হওয়ায় ধৈর্য, সতর্ক পরিকল্পনা এবং নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা প্রয়োজন হয়। পৃথিবী থেকে লাখ লাখ মাইল দূরে ভবিষ্যৎ মহাকাশ অভিযানে এসব গুণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।
ওয়াইচের মতে, চাপেয়া অভিযানের অভিজ্ঞতা ও গবেষণালব্ধ শিক্ষা ভবিষ্যতে প্রথমে চাঁদে এবং একদিন মঙ্গল গ্রহে মানুষ পাঠানোর পথ আরও সহজ করবে।
সূত্র: রয়টার্স