মার্কিন বিমানে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের দোহাই দিয়ে কেশম দ্বীপে হামলা

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঠিক আগের দিন ইরানের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কেশম দ্বীপে হামলা চালিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ইরানের সঙ্গে নতুন করে বড় ধরনের যুদ্ধের সম্ভাবনা কম বলে মন্তব্য করছেন এবং কূটনৈতিক সমঝোতার কথাও বলছেন, তখন এই হামলার খবর সামনে আসে।

ওয়াশিংটনের দাবি, এটি নতুন করে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর পদক্ষেপ নয়; বরং হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন সামরিক সম্পদ ও বাণিজ্যিক নৌপরিবহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সীমিত প্রতিরক্ষামূলক অভিযান।

সোমবার (২ নভেম্বর) কেশম দ্বীপে হামলার বিষয়টি মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে প্রথমে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল প্রকাশ করে। পরে রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) ও সিবিএস নিউজও মার্কিন কর্মকর্তাদের বক্তব্যের ভিত্তিতে হামলার খবর নিশ্চিত করে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আইআরএনএ জানিয়েছে, দ্বীপটিতে একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।

হামলার পেছনে সবচেয়ে সরাসরি যে কারণটি সামনে এসেছে, তা হলো হরমুজ প্রণালিতে একটি মার্কিন বিমানের দিকে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ।

সিবিএস নিউজকে তিনজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আইআরজিসি একটি মার্কিন বিমানের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার পর কেশম দ্বীপে হামলা চালানো হয়। রয়টার্সের প্রতিবেদনে এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, ইরানি বাহিনী মার্কিন সামরিক সম্পদের বিরুদ্ধে ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছিল। এর জবাবে আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা হিসেবে হামলা চালানো হয়েছে।

অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে একজন মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বলা হয়, কেশম দ্বীপে আইআরজিসির একটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণব্যবস্থা ধ্বংস করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, আত্মরক্ষার অংশ হিসেবে যুদ্ধবিমান থেকে হামলা চালিয়ে লঞ্চারটি ধ্বংস করা হয়।

তবে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ঘটনা, এর লক্ষ্যবস্তু এবং হামলার সামরিক ফলাফল সম্পর্কে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে মার্কিন কর্মকর্তাদের দেওয়া ব্যাখ্যাকে এখন পর্যন্ত ওয়াশিংটনের দাবি হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।

হামলার দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে সামনে এসেছে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা।

দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর প্রতিবেদনে মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছেন, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরানের বিরুদ্ধে সীমিত আকারে একাধিক হামলা চালানো হয়েছে। এসব অভিযানের উদ্দেশ্য ইরানকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে হুমকি সৃষ্টি বা হামলা করার সক্ষমতা অর্জন থেকে বিরত রাখা।

হরমুজ প্রণালি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। এই পথে অস্থিরতা তৈরি হলে তেল ও গ্যাস পরিবহন, আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল এবং জ্বালানি বাজারে প্রভাব পড়তে পারে।

এর আগে ৩১ আগস্ট প্রকাশিত অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের রাডার, আকাশ প্রতিরক্ষা ও জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল মার্কিন সামরিক বাহিনী। তেলবাহী জাহাজ, মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজ ও সামরিক বিমানের ওপর সম্ভাব্য হামলার ঝুঁকি কমাতে সীমিত সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে তিন মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানিয়েছিল সংবাদমাধ্যমটি।

অর্থাৎ কেশম দ্বীপে সোমবারের হামলাকে শুধু একটি তাৎক্ষণিক ঘটনার প্রতিক্রিয়া হিসেবে নয়, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের সামরিক সক্ষমতা সীমিত রাখার বৃহত্তর মার্কিন কৌশলের অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

এই হামলার সময় নিয়েই তৈরি হয়েছে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন। আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন। নির্বাচনের আগে ইরানে নতুন করে হামলা চালানো হবে না বলে এর আগে প্রকাশ্যেই ঘোষণা দিয়েছিলেন ট্রাম্প।

গত ৮ অক্টোবর দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট-এ প্রকাশিত অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে সামরিক হামলা পুনরায় শুরু করবে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যেও তিনি নির্বাচনের আগে হামলা না চালানোর কথা বলেছিলেন। একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে আলোচনায় অগ্রগতির কথাও উল্লেখ করেছিলেন।

কিন্তু ২ নভেম্বর, নির্বাচনের ঠিক আগের দিন, কেশম দ্বীপে হামলার খবর আসে। এদিকে সোমবার সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প বলেন, “ইরানের সঙ্গে আমাদের যুদ্ধ হয়েছিল। আমরা জিতেছি। এটিকে যুদ্ধ বলবেন কি না জানি না, কারণ আমরা কয়েক মাস ধরে কোনো লড়াই করছি না।”

তাঁর বক্তব্য ও হামলার খবরের মধ্যে স্পষ্ট বৈপরীত্য দেখা যায়। তবে নির্বাচনের ফল প্রভাবিত করা বা রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার উদ্দেশ্যেই হামলা চালানো হয়েছে—এমন কোনো প্রমাণ এখন পর্যন্ত প্রকাশিত হয়নি। হামলার সময়কে ঘিরে রাজনৈতিক প্রশ্ন থাকলেও মার্কিন কর্মকর্তারা এর সামরিক ও নিরাপত্তাগত কারণই সামনে এনেছেন।

দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সীমিত হামলার বিষয়টি প্রকাশ্যে ঘোষণা করা হয়নি। একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বড় ধরনের সামরিক অভিযান আবার শুরু করার ইঙ্গিত যেন না যায়, সে জন্যই ওয়াশিংটন এসব হামলা নিয়ে নীরব ছিল।

রয়টার্সের প্রতিবেদনেও মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছেন, কেশম দ্বীপে হামলাটি সীমিত ছিল এবং এটি বড় আকারের সামরিক অভিযান পুনরায় শুরুর ইঙ্গিত নয়। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র একদিকে ইরানের সামরিক সক্ষমতার ওপর চাপ বজায় রাখতে চাইছে, অন্যদিকে সংঘাতকে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে রূপ নেওয়া থেকে বিরত রাখার বার্তাও দিচ্ছে।

এই কৌশলের পেছনে সামরিক ও অর্থনৈতিক হিসাব রয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদে জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করা যুক্তরাষ্ট্র ও তার উপসাগরীয় মিত্রদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে নতুন করে বড় যুদ্ধ শুরু হলে জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তার প্রভাব পড়তে পারে।

সামরিক হামলার পাশাপাশি কূটনৈতিক যোগাযোগও চালু রয়েছে। এপি জানিয়েছে, সোমবার মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইরানের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে বেশ কয়েক দফা ভালো আলোচনা হয়েছে এবং একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।

ভ্যান্স আরও জানান, ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান মোহসেন রেজায়িকে গত সপ্তাহে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছিল। তবে হোয়াইট হাউস ওই চিঠির বিস্তারিত প্রকাশ করেনি।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও কাতারের মধ্যস্থতায় ইরানের সঙ্গে সমঝোতার আলোচনা চলছিল বলে সিবিএস নিউজ জানিয়েছে। ফলে একই সময়ে সামরিক চাপ ও কূটনৈতিক যোগাযোগ—দুই পথেই এগোচ্ছে ওয়াশিংটন।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আইআরএনএ জানিয়েছে, সোমবার রাতে কেশম দ্বীপে একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। দেশটির সংবাদমাধ্যমগুলো উপকূলীয় শহর বান্দর লেঙ্গেহেও বিস্ফোরণের খবর দিয়েছে। তবে হামলায় কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বা কেউ হতাহত হয়েছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

অন্যদিকে আইআরজিসি হরমুজ প্রণালির কাছে মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত ও আটক করার দাবিও করেছে। এসব দাবির সবকিছু স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রও ড্রোনসংক্রান্ত সব ইরানি দাবির বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া জানায়নি।

সব মিলিয়ে কেশম দ্বীপে হামলার পেছনে ওয়াশিংটনের প্রকাশিত যুক্তি তিনটি—মার্কিন বিমানের বিরুদ্ধে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের জবাব, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা এবং ইরানের সামরিক সক্ষমতা সীমিত রাখা। তবে নির্বাচনের ঠিক আগের দিন হামলার ঘটনা ট্রাম্পের আগের প্রতিশ্রুতি ও কূটনৈতিক সমঝোতার বার্তার সঙ্গে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।

এ মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সীমিত হামলা ও পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপের মধ্যে দুই দেশ আলোচনার পথ ধরে রাখতে পারে কি না। কারণ হরমুজ প্রণালিতে নতুন করে বড় সংঘাত শুরু হলে তার প্রভাব শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বিশ্ব জ্বালানি বাজার ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যও এর ধাক্কা অনুভব করতে পারে।