যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ডেটা সেন্টার সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে বড় ধরনের জনমত তৈরি হয়েছে। টেক্সাসসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে ডেটা সেন্টার নির্মাণ সীমিত বা স্থগিত করার পক্ষে ভোট দিয়েছেন নাগরিকেরা। প্রযুক্তি খাতের শত শত বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ এবং ১০ ট্রিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য অবকাঠামো সম্প্রসারণ পরিকল্পনা নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
যুক্তরাষ্ট্রের এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থান, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং ইরান যুদ্ধের পাশাপাশি নতুন করে আলোচনায় এসেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। ভোটারদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, এআই প্রযুক্তির দ্রুত সম্প্রসারণকে প্রযুক্তিগত বিস্ময় হিসেবে তুলে ধরা হলেও এর প্রকৃত মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে। বিশেষ করে বিপুল বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবহার, পরিবেশদূষণ, আবাসন ও জমির ওপর চাপ এবং বিদ্যুতের বাড়তি খরচ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
আমেরিকানস ফর রেসপনসিবল ইনোভেশনের সহপ্রতিষ্ঠাতা ব্র্যাড কারসন এই নির্বাচনী ফলাফলকে ‘এআই ভূমিকম্প’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার ভাষায়, ভোটাররা স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন- এআই ও ডেটা সেন্টার নির্মাণের ক্ষেত্রে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও নীতিমালা চান তারা।
টেক্সাসে বড় ধাক্কা প্রযুক্তি শিল্পের
নির্বাচনের সবচেয়ে বড় চমক এসেছে টেক্সাসে। সেখানে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জিনা হিনোজোসার গভর্নর নির্বাচনে জয় এআই অবকাঠামো সম্প্রসারণ পরিকল্পনাকে নতুন অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে। হিনোজোসা নির্বাচনী প্রচারে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, পানি, বিদ্যুৎ, বায়ুদূষণ ও সম্পত্তির অধিকারসংক্রান্ত প্রভাব মোকাবিলায় আইন প্রণয়ন না হওয়া পর্যন্ত ডেটা সেন্টার নির্মাণে স্থগিতাদেশ বহাল রাখবেন। ২০২৭ সালের মাঝামাঝি শেষ হতে যাওয়া অঙ্গরাজ্যের আইনসভা অধিবেশনে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা রয়েছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেমিঅ্যানালাইসিসের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন ডেটা সেন্টার সক্ষমতার ৪১ শতাংশই আসার কথা টেক্সাস থেকে। ফলে সেখানে ছয় মাসের বেশি সময় নির্মাণকাজ স্থগিত থাকলে প্রযুক্তি খাতের সম্প্রসারণ পরিকল্পনায় বড় ধরনের বিলম্ব হতে পারে। টেক্সাসের পর নতুন ডেটা সেন্টার সক্ষমতার দিক থেকে এগিয়ে থাকা ওহাইও, জর্জিয়া ও অ্যারিজোনাতেও ডেমোক্র্যাটরা জয় পেয়েছেন। এসব রাজ্যে বিজয়ী কয়েকজন প্রার্থী ডেটা সেন্টার নির্মাণে কঠোর বিধিনিষেধের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
১০ রাজ্যে ৪১টি প্রস্তাব, জনমতের বড় বার্তা
নির্বাচনে প্রযুক্তি সম্প্রসারণবিরোধী মনোভাব শুধু গভর্নর বা আইনপ্রণেতা নির্বাচনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ডেটা সেন্টার নির্মাণ নিয়ে সরাসরি ভোটাভুটিও হয়েছে। নির্বাচনের আগে প্রকাশিত ব্যালটপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ১০টি অঙ্গরাজ্যে ৪১টি প্রস্তাব ভোটারদের সামনে ছিল। এর মধ্যে ২৮টি প্রস্তাবের উদ্দেশ্য ছিল ডেটা সেন্টার নির্মাণ সীমিত বা নিষিদ্ধ করা। বাকি ১৩টি প্রস্তাব ছিল নির্মাণ সহজ করা বা অনুমোদনের পক্ষে। ওহাইওতে সবচেয়ে বেশি ২১টি প্রস্তাব নিয়ে ভোটাভুটি হয়েছে। মেইন, ইলিনয়, কানসাসসহ অন্যান্য রাজ্যেও ডেটা সেন্টারবিরোধী প্রস্তাব ছিল।
সিলিকন ভ্যালির বিলিয়নিয়ারদের জন্য সতর্কবার্তা
এআই প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা থাকলেও ভোটের ফলাফল তাদের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। জর্জিয়ার ডেমোক্র্যাট সিনেটর জন অসফ নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর দেওয়া বক্তব্যে সিলিকন ভ্যালির প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সমালোচনা করেছেন। তার অভিযোগ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাব্য বিপর্যয় নিয়ে সতর্কবার্তা দেওয়া প্রযুক্তি উদ্যোক্তারাই নিজেদের নিরাপত্তার জন্য বিশেষ বাংকার তৈরি করছেন।
অন্যদিকে নিউইয়র্কের আইনপ্রণেতা ও RAISE Act-এর অন্যতম প্রণেতা অ্যালেক্স বোরেসের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে এআই এখন অন্যতম বড় ইস্যু হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। সমাজ ও অর্থনীতির প্রতিটি ক্ষেত্রে এআইয়ের প্রভাব পড়ছে, যার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে নির্বাচনী রাজনীতিতেও।
ক্যালিফোর্নিয়ায় ধনকুবেরদের সম্পদ কর প্রস্তাব নিয়ে বিতর্ক
প্রযুক্তি খাতের প্রভাব নিয়ে বিতর্কের আরেকটি দিক ছিল ক্যালিফোর্নিয়ার প্রস্তাবিত সম্পদ কর। সেখানে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদের মালিক ব্যক্তি ও ট্রাস্টের ওপর ৫ শতাংশ কর আরোপের প্রস্তাব ছিল। তবে নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফলে প্রস্তাবটি পরাজয়ের দিকে ছিল। গভর্নর গ্যাভিন নিউসমসহ প্রভাবশালী ডেমোক্র্যাট নেতা এবং প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ ব্যক্তিরা এর বিরোধিতা করেছিলেন।
কেন এআই নিয়ে ক্ষুব্ধ হচ্ছেন সাধারণ মানুষ?
এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের জন্য প্রয়োজন হচ্ছে বিশাল আকারের ডেটা সেন্টার। এসব কেন্দ্রে হাজার হাজার সার্ভার, কুলিং ব্যবস্থা এবং বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। অনেক ক্ষেত্রে পানি ব্যবহারও অত্যন্ত বেশি। ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে কয়েকটি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে:
১. বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি: ডেটা সেন্টারের বিপুল বিদ্যুৎ চাহিদা স্থানীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ২. পানির সংকট: সার্ভার ঠান্ডা রাখতে বিপুল পানি ব্যবহারের কারণে স্থানীয় পানিসম্পদের ওপর চাপ বাড়তে পারে। ৩. পরিবেশদূষণ: বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বাড়লে কার্বন নিঃসরণও বাড়তে পারে। ৪. জমি ও আবাসনসংকট: বড় আকারের ডেটা সেন্টার নির্মাণের জন্য বিস্তীর্ণ জমি প্রয়োজন হয়। এতে স্থানীয় ভূমি ব্যবহার ও আবাসন পরিকল্পনায় পরিবর্তন আসতে পারে। ৫. অর্থনৈতিক বৈষম্য: প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো বিপুল মুনাফা করলেও সেই উন্নয়নের ব্যয় স্থানীয় জনগণকে বহন করতে হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে জনমতই বড় শক্তি
যুক্তরাষ্ট্রের এই নির্বাচনী প্রবণতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে এনেছে। প্রযুক্তির উন্নয়ন যত দ্রুতই হোক, তার সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। এআই বিপ্লবের নেতৃত্ব দিতে চাওয়া সিলিকন ভ্যালির কোম্পানিগুলো এতদিন বিনিয়োগ, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও বাজার দখলের প্রতিযোগিতাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। কিন্তু এখন স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বিদ্যুৎ, পানি, পরিবেশ ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের প্রশ্ন সেই প্রতিযোগিতার সামনে নতুন বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
তবে এই ফলাফলকে এআই প্রযুক্তির বিরুদ্ধে চূড়ান্ত গণরায় হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বরং এটি প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে জনমতের প্রতিফলন। ডেটা সেন্টার নির্মাণ পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার চেয়ে পরিবেশগত সুরক্ষা, স্থানীয় জনগণের সম্মতি, বিদ্যুৎ-পানির ব্যবহার এবং কোম্পানিগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করার চাপ বাড়তে পারে। সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে এআই এখন আর শুধু প্রযুক্তি বা ব্যবসার বিষয় নয়; এটি জনজীবন, অর্থনীতি, পরিবেশ ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহির গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।