যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পর ইরান যুদ্ধ নিয়ে নতুন করে কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে পড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানে আবার সামরিক হামলা চালানো, কূটনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছানো অথবা নৌ অবরোধ ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত রাখার—এই তিনটি পথ তাঁর সামনে রয়েছে। তবে প্রতিটি পথেই রয়েছে রাজনৈতিক ও কৌশলগত ঝুঁকি।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলে তিনটি বিকল্পের পক্ষেই আলাদা আলাদা অবস্থান রয়েছে। ফলে ইরান প্রশ্নে হোয়াইট হাউসের ভেতরেও মতভেদ স্পষ্ট।
অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রথম বিকল্প হলো ইরানে আবার সামরিক হামলা শুরু করা। তবে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে তা যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিকভাবে অজনপ্রিয় হতে পারে। এতে জ্বালানির দাম উঁচু থাকতে পারে, পাশাপাশি আগের সামরিক অভিযানের তুলনায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য আসবে কি না, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে।
দ্বিতীয় বিকল্প হলো ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানো। কিন্তু তেহরান যদি কোনো ছাড় দিতে রাজি না হয়, কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী বিপর্যয়কে দুর্বলতা হিসেবে বিবেচনা করে আরও কঠোর শর্ত দেয়, তাহলে আলোচনা সফল করা ট্রাম্পের জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
তৃতীয় বিকল্প হচ্ছে সরাসরি যুদ্ধ ও সমঝোতা—দুটিই আপাতত এড়িয়ে বর্তমান নীতি অব্যাহত রাখা। এর অর্থ, ইরানের ওপর নৌ অবরোধ ও কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বজায় রেখে দেশটিকে দীর্ঘমেয়াদি চাপে রাখা। তবে এই কৌশলে প্রত্যাশিত ফল পেতে কয়েক মাস লেগে যেতে পারে।
ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে সমঝোতার পক্ষে নেতৃত্ব দিচ্ছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তিনি মনে করেন, নতুন করে যুদ্ধ শুরু করলেই পরিস্থিতির উন্নতি হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া উচিত।
অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভ্যান্স ব্যক্তিগত আলোচনায় ইরান বিষয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মূল্যায়নের সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, ইরান যুদ্ধ রিপাবলিকানদের নির্বাচনী পরাজয়ের অন্যতম কারণ।
বুধবার ভ্যান্স প্রকাশ্যে বলেন, যুদ্ধের কারণেই রিপাবলিকানরা নির্বাচনে বড় ধাক্কা খেয়েছে। ট্রাম্পও তাঁর এই মূল্যায়নকে অনেকাংশে সত্য বলে স্বীকার করেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্টের মতে, যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। তবে একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না দেওয়ার জন্য সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন ছিল এবং পরিস্থিতি একই হলে তিনি আবারও এমন পদক্ষেপ নিতেন।
কূটনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি ইরানে বড় ধরনের সামরিক অভিযান পুনরায় শুরুর প্রস্তুতিও নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, সম্ভাব্য সংঘাতের জন্য সামরিক প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে। এ লক্ষ্যে মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত সামরিক সরঞ্জাম ও সক্ষমতা পাঠানো হচ্ছে।
অন্যদিকে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পুনরায় শুরুর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর যুক্তি, ইরানকে বিশ্বাস করে কোনো চুক্তিতে পৌঁছানো কিংবা চুক্তি হলে তা মেনে চলবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথও সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে রয়েছেন।
ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট, সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বর্তমান ‘যুদ্ধ নয়, চুক্তিও নয়’—এমন অবস্থান বজায় রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন বলে অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
তাঁদের ধারণা, নৌ অবরোধ ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে ইরানের ওপর চাপ অব্যাহত রাখলে দেশটি শেষ পর্যন্ত আলোচনায় আরও ছাড় দিতে বাধ্য হতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সংকটের ফলে ইরানের অভ্যন্তরে অস্থিতিশীলতা তৈরির সম্ভাবনার কথাও মার্কিন কর্মকর্তাদের আলোচনায় এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী পরাজয়কে ইরানের কর্মকর্তারা নিজেদের বিজয় হিসেবে তুলে ধরছেন। তাঁদের বক্তব্য, যুদ্ধক্ষেত্র ও হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক অঙ্গনেও ট্রাম্প পরাজিত হয়েছেন।
তবে ইরানের এই আত্মবিশ্বাসী প্রতিক্রিয়া ট্রাম্পকে আরও কঠোর সামরিক অবস্থান নিতে উৎসাহিত করতে পারে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক আলোচনার সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন ব্যক্তি, ট্রাম্পের উপদেষ্টা ও মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা।
সব মিলিয়ে নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর ইরান যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে ট্রাম্পের সামনে সহজ কোনো পথ নেই। সামরিক অভিযান রাজনৈতিক চাপ বাড়াতে পারে, আলোচনায় ব্যর্থতা তাঁর অবস্থানকে দুর্বল করতে পারে, আর দীর্ঘমেয়াদি অবরোধে ফল পেতে সময় লাগতে পারে। ফলে ওয়াশিংটনের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কোন দিকে এগোবে।