ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের সঙ্গে সংঘাত বন্ধে ৫১ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে। একই সঙ্গে ইয়েমেনের শাসক হিসেবে গোষ্ঠীটিকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার দাবিও জানিয়েছে তারা। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল বৃহস্পতিবার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।
আলোচনার বিষয়ে অবগত ব্যক্তিদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের বছরের পর বছর ধরে চালানো সামরিক হামলা এবং দীর্ঘস্থায়ী অবরোধের ক্ষতিপূরণ হিসেবে ৫১ বিলিয়ন ডলার চেয়েছে হুথিরা। তবে আলোচনায় পরবর্তী সময়ে ক্ষতিপূরণের অঙ্ক নিয়ে আরও কিছু প্রস্তাব এসেছে। হুথিদের অবস্থান হলো, সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসতে হলে সৌদি আরবকে কয়েক দশক বিলিয়ন ডলারের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
শুধু অর্থ নয়, ইয়েমেনের শাসক হিসেবে নিজেদের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিও চায় গোষ্ঠীটি। এ দাবি মেনে নিলে সৌদি আরবকে কার্যত নিজের দক্ষিণ সীমান্তে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র প্রতিপক্ষের শাসন মেনে নিতে হবে। রিয়াদের জন্য এটি বড় ধরনের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত ছাড় হবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লোহিত সাগরে সৌদি আরবের তেলবাহী জাহাজে হুথি হামলা এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপর নজরদারির সুবিধা রয়েছে—এমন ভূখণ্ড দখলের পর সৌদি আরব সংঘাত বন্ধের সম্ভাবনা যাচাই করতে হুথিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। এর জবাবে ক্ষতিপূরণ ও রাজনৈতিক স্বীকৃতির দাবি তোলে গোষ্ঠীটি।
বাব আল-মান্দেব প্রণালি লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে যুক্ত করেছে। ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং জ্বালানি পরিবহনের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। এ প্রণালির আশপাশে হুথিদের সামরিক অবস্থান শক্তিশালী হলে লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল এবং সৌদি আরবের তেল রপ্তানির ওপর চাপ বাড়তে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুথিদের সঙ্গে সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসতে সৌদি আরবকে একাধিক কঠিন বিকল্পের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। একদিকে সামরিক অভিযান জোরদার করলে প্রাণহানি ও অভ্যন্তরীণ চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে হুথিদের দাবি মেনে নিলে গোষ্ঠীটির রাজনৈতিক ও সামরিক অবস্থান আরও শক্তিশালী হতে পারে।
ইয়েমেনের রাজধানী সানাসহ দেশটির বড় অংশ ২০১৪ সাল থেকে হুথিদের নিয়ন্ত্রণে। ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন দিতে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট দেশটিতে অভিযান শুরু করে। দীর্ঘ সংঘাত ও অবরোধে ইয়েমেনের অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং দেশটিতে ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, হুথিদের সাম্প্রতিক সামরিক অগ্রগতি সৌদি আরবের জন্য নতুন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। বিশেষ করে ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী এডেনের দিকে তাদের অগ্রসর হওয়া রিয়াদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
ইয়েমেনের বিশ্লেষক ও সানা সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের সহপ্রতিষ্ঠাতা মাজেদ আল-মাধাজির মতে, হুথিদের ক্ষতিপূরণ দাবির চেয়েও বড় উদ্বেগ হলো—সামরিক চাপ প্রয়োগ করে ভবিষ্যতে বারবার সৌদি আরবের কাছ থেকে অর্থ ও রাজনৈতিক ছাড় আদায়ের নজির তৈরি হওয়া।
অন্যদিকে সৌদি আরবের সামরিক পদক্ষেপের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। দেশটির দক্ষিণে হুথি, পূর্বে ইরান এবং উত্তরে ইরাকের শিয়া মিলিশিয়াদের সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর চাপ রয়েছে।
সব মিলিয়ে, ৫১ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতিপূরণ ও রাজনৈতিক স্বীকৃতির দাবি সৌদি-হুথি আলোচনাকে আরও জটিল করে তুলেছে। তবে এই দাবি চূড়ান্ত সমঝোতা বা সৌদি আরবের সম্মতি নয়; আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বরাতে প্রকাশিত তথ্য।