মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল এশিয়ায় কী প্রভাব ফেলতে পারে?

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার রিপাবলিকান পার্টির বড় পরাজয়ের প্রভাব পড়তে পারে এশিয়ার ভূরাজনীতিতেও। বিশেষ করে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো মিত্রদেশের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্কে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরতে পারে। একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে প্রযুক্তি ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মার্কিন নীতিতে কঠোরতা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ার সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি ও বৈদেশিক সম্পর্কবিষয়ক অধ্যাপক ব্রেন্ডন ও’কনর আল-জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এমন বিশ্লেষণ করেছেন। ও’কনরের মতে, নির্বাচনের ফল যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিকে এশিয়ার মিত্রদের সঙ্গে তুলনামূলক পরিচিত ও ধারাবাহিক অবস্থানে ফিরিয়ে নিতে পারে। তার ভাষায়, কোরীয় যুদ্ধের পর থেকে যে ধরনের প্রচলিত কূটনৈতিক সম্পর্ক দেখা গেছে, ওয়াশিংটন আবার অনেকটা সেই ধারায় ফিরতে পারে।

ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে তার আকস্মিক সিদ্ধান্ত ও অবস্থান পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করেন ও’কনর। তার মতে, নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয় উত্তর-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জন্য কিছুটা স্বস্তির কারণ হতে পারে। বিশেষ করে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা ও সামরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে আরও পূর্বানুমানযোগ্য পরিবেশ চাইবে। ট্রাম্পের ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও পরিবর্তনশীল কূটনৈতিক অবস্থান এ অঞ্চলের মিত্রদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছিল। কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ বাড়ায় সেই নীতির ওপর রাজনৈতিক নজরদারিও বাড়তে পারে।

তবে নির্বাচনের ফলেই যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতিতে তাৎক্ষণিক পরিবর্তন আসবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। কারণ- সামরিক ও বৈদেশিক নীতির গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে মার্কিন প্রেসিডেন্টের হাতে এখনো ব্যাপক নির্বাহী ক্ষমতা রয়েছে। ও’কনরের বিশ্লেষণে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা। তার মতে, ওয়াশিংটন চীনের প্রতি ট্রাম্পের তুলনামূলক নমনীয় অবস্থান নিয়ে নতুন করে বিতর্কে জড়াতে পারে।

বিশেষ করে উন্নত প্রযুক্তির চিপ চীনে বিক্রি করার অনুমতি দেওয়া উচিত কি-না, তা আবার রাজনৈতিক আলোচনায় আসতে পারে। এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াংয়ের প্রভাবের কথা উল্লেখ করে ও’কনর বলেন, উন্নত প্রযুক্তির চিপ চীনে বিক্রির বিষয়ে ট্রাম্প তুলনামূলক শিথিল অবস্থান নিয়েছেন। কিন্তু কংগ্রেসে চীনবিরোধী কঠোর অবস্থানের সমর্থন দুই দলেই রয়েছে। ফলে উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চিপ, সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন প্রযুক্তি এবং প্রযুক্তি রপ্তানির ওপর নতুন বিধিনিষেধ আরোপের উদ্যোগ জোরালো হতে পারে।

নির্বাচনের পর এশিয়ার দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতি, শুল্ক আরোপ এবং নিরাপত্তা সহযোগিতায় আরও ধারাবাহিকতা আশা করছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, কংগ্রেসে ক্ষমতার পালাবদল মানেই ট্রাম্পের নীতিতে মৌলিক পরিবর্তন নয়। আল-জাজিরার আরেকটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির চাপেও রয়েছে। ফলে তাদের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতি ও নিরাপত্তা নিশ্চয়তার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির স্থিতিশীলতাও গুরুত্বপূর্ণ।

এদিকে সিঙ্গাপুরের এস রাজরত্নম স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের বিশ্লেষক কেভিন চেনের মতে, কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির ওপর নজরদারি বাড়াবে। তবে প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতার কারণে এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে তাৎক্ষণিক ও ব্যাপক পরিবর্তন নাও আসতে পারে।

সব মিলিয়ে, মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক আচরণে কিছুটা ভারসাম্য ও পূর্বানুমানযোগ্যতা ফেরানোর সুযোগ তৈরি করেছে। তবে চীনের সঙ্গে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা, বাণিজ্যিক শুল্ক এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতির প্রশ্নে ওয়াশিংটনের কঠোর অবস্থান অব্যাহত থাকার সম্ভাবনাই বেশি।