ইসরায়েলের পরবর্তী সরকার গঠনের দায়িত্ব কাকে দেওয়া হবে, তা আগামী রোববার (৮ নভেম্বর) ঘোষণা করবেন দেশটির প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ। পার্লামেন্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর পরিবর্তে বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকটকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়ার পক্ষে মত দেওয়ার পর এ ঘোষণা দিলেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) দেশটির ১২০ আসনের পার্লামেন্ট নেসেটে নির্বাচিত দলগুলোর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা শেষে হারজগ এ সিদ্ধান্তের কথা জানান। আলোচনায় ৬৭ জন আইনপ্রণেতা সাবেক সেনাপ্রধান আইজেনকটকে সমর্থন করেন। অন্যদিকে নেতানিয়াহুর পক্ষে মত দেন ৪৬ জন।
আলোচনা শেষে টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে হারজগ বলেন, পরামর্শের ফলাফল আপাতদৃষ্টিতে স্পষ্ট মনে হলেও বিভিন্ন রাজনৈতিক জোটের মধ্যে এবং একই জোটের শরিকদের মধ্যেও পারস্পরিক আপত্তি রয়েছে। এ কারণে কার পক্ষে সরকার গঠনের জোট তৈরি করা সহজ হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
তিনি জানান, শুক্রবার ও শনিবার ইসরায়েলের সাপ্তাহিক ছুটির সময় কয়েকটি দলের নেতার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে আলোচনা করবেন। এরপর রোববার সরকার গঠনের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রার্থীর নাম ঘোষণা করবেন।
গত ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে নেতানিয়াহু কিংবা আইজেনকট—কেউই পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে পারেননি। ফলে গভীর রাজনৈতিক বিভাজনের মধ্যে সরকার গঠনের দায়িত্ব কাকে দেওয়া হবে, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন প্রেসিডেন্ট।
নির্বাচনে একক দল হিসেবে সবচেয়ে বেশি ২৭টি আসন পেয়েছে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি। তবে তার ধর্মীয় ও জাতীয়তাবাদী দলগুলোর জোট সম্মিলিতভাবে পেয়েছে ৫৩টি আসন। অন্যদিকে মধ্য-বাম থেকে ডানপন্থি—বিভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থানের চারটি ইহুদি-নেতৃত্বাধীন দলের সমন্বয়ে গঠিত আইজেনকটের জোট পেয়েছে ৪৮টি আসন। নির্বাচনের আগে জনমত জরিপগুলোতে দুই পক্ষের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস দেওয়া হয়েছিল।
এ ছাড়া ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকারী দুটি দল পেয়েছে মোট ১৯টি আসন, যা দেশটির নির্বাচনী ইতিহাসে নজিরবিহীন।
নেতানিয়াহুর মতো আইজেনকটও আরব-নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সঙ্গে সরকার গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করেছেন। তবে ওই দুটি দলই আইজেনকটকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়ার সুপারিশ করেছে। ফলে আইনপ্রণেতাদের মধ্যে তার পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন তৈরি হয়েছে।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে দেওয়া বক্তব্যে আরব দলগুলোর জোট জয়েন্ট লিস্টের জ্যেষ্ঠ নেতা আহমেদ তিবি বলেন, ‘অপরাধী এই সরকারকে সরাতে আমরা অতীতে যা করিনি, এবার তা করতে চাই।’
আইজেনকটের দল ইয়াশার জানিয়েছে, ২০১৫ সালের পর থেকে কোনো প্রার্থীই সরকার গঠনের দায়িত্ব পাওয়ার জন্য এত বেশি আইনপ্রণেতার সুপারিশ পাননি। তাই জাতীয় জরুরি সরকার গঠনের সুযোগ তৈরি করতে দ্রুত আইজেনকটের হাতে দায়িত্ব দেওয়ার জন্য প্রেসিডেন্টের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে দলটি।
এদিকে বৃহস্পতিবার নেতানিয়াহুর জন্য আরেকটি ধাক্কা এসেছে দীর্ঘদিনের মিত্র উনাইটেড তোরাহ জুডাইজমের কাছ থেকে। অতি-গোঁড়া ইহুদিদের প্রতিনিধিত্বকারী প্রধান দুটি দলের একটি এই দল এবার কোনো প্রার্থীকেই সমর্থনের সুপারিশ করেনি।
টাইমস অব ইসরায়েলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অতি-গোঁড়া ইহুদি পুরুষদের বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার আইন পাস করতে নেতানিয়াহুর জোট ব্যর্থ হওয়ায় দলটি তার সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করেছে।
আইজেনকটের জোটের শরিক ডেমোক্র্যাটস পার্টির সদস্য ইয়ারিভ ওপেনহাইমার আলজাজিরাকে বলেন, রোববার হারজগ আইজেনকটকে সরকার গঠনের দায়িত্ব না দেওয়ার কোনো কারণ তিনি দেখছেন না। তার মতে, উনাইটেড তোরাহ জুডাইজম ইঙ্গিত দিয়েছে, উপযুক্ত রাজনৈতিক সমঝোতা হলে তাদের সমর্থন পাওয়া সম্ভব। আইজেনকট যথেষ্ট ভালো প্রস্তাব দিতে পারলে প্রয়োজনীয় সমর্থনও পেতে পারেন।
তিনি আরও বলেন, নেতানিয়াহুর সরকার গঠনের কোনো সুযোগই নেই।
প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে দায়িত্ব পাওয়ার পর সরকার গঠনের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রার্থী ২৮ দিন সময় পাবেন। প্রয়োজনে এ সময় আরও ১৪ দিন বাড়ানো যেতে পারে। নতুন জোট সরকার গঠিত না হওয়া পর্যন্ত নেতানিয়াহু তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো প্রার্থী সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে আবার নির্বাচন আয়োজন করতে হবে।
ক্ষমতা হারানোর ঝুঁকিতে থাকা নেতানিয়াহু নির্বাচনে সম্ভাব্য ভোট কারচুপি নিয়ে নির্বাচন কর্মকর্তাদের তদন্তকে সামনে এনে ফলাফল নিয়ে সন্দেহ তৈরি করছেন। তার অভিযোগ, আরব-নেতৃত্বাধীন দলগুলো ভোট চুরি করেছে। তবে এ অভিযোগের সমালোচনা করেছেন বিরোধীরা। তাদের দাবি, নির্বাচনের ফলাফল প্রশ্নবিদ্ধ করে নেতানিয়াহু ও তার মিত্ররা ফলাফলকে দুর্বল করার চেষ্টা করছেন। নেতানিয়াহু অবশ্য এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
বুধবার ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি জানিয়েছে, নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা বা স্বচ্ছতা ক্ষুণ্ন হওয়ার কোনো ঘটনা ঘটেনি। কমিটির প্রধান ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নোয়াম সোলবার্গ নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের প্রতি জনগণের আস্থা রক্ষার আহ্বান জানিয়েছেন।
বুধবার প্রেসিডেন্টের বাসভবনে হারজগের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে সোলবার্গ বলেন, ‘এটি সত্যিকারের বিপদ। গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি হলো শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর।’ আরব সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের বেশি সংখ্যায় ভোট দিতে আসাকে তিনি ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করেন।
তবে নেতানিয়াহুর কট্টর ডানপন্থি মিত্রদের কেউ কেউ নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরসহ কয়েকজন আরব দলগুলোর নেতাদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার ও জিজ্ঞাসাবাদের দাবি জানিয়েছেন।
সূত্র: আল-জাজিরা