পাকিস্তানকে যুদ্ধ বিমানের ইঞ্জিন দিচ্ছে রাশিয়া

'চিরশত্রু' পাকিস্তানের কাছে চীনা যুদ্ধবিমান জেএফ-১৭-এর জন্য অত্যাধুনিক রুশ ইঞ্জিন বিক্রির খবরে নড়েচড়ে বসেছে ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গন। যদিও মস্কোর একটি সূত্র জানিয়েছে, এই ইঞ্জিন সরবরাহের কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত এখনও নেওয়া হয়নি, তবুও বিরোধী দল কংগ্রেস এই ঘটনাকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কূটনৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।

গণমাধ্যমের দাবি, পাকিস্তানের অস্ত্রভাণ্ডারে থাকা জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমানের জন্য রাশিয়া এই ইঞ্জিন সরবরাহ করবে। এমন খবর ছড়িয়ে পড়তেই নয়াদিল্লির রাজনীতিতে উত্তেজনা দেখা দেয়। কংগ্রেসের অভিযোগ, যখন মোদি সরকার যুক্তরাষ্ট্রের বিপরীতে দাঁড়িয়েও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই রাশিয়া ভারতের শত্রু দেশকে সামরিক সরঞ্জাম দিচ্ছে। কংগ্রেসের মুখপাত্র জয়রাম রমেশ সামাজিক মাধ্যমে জানান, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ব্যক্তিগত কূটনীতি শুধুই প্রদর্শনীমূলক এবং এর কোনো বাস্তব কৌশলগত ফল নেই। তিনি মোদি সরকারের কাছে এই বিষয়ে জবাবদিহিতা দাবি করেছেন।

তবে সেই বিতর্কের পালে ভারতের পক্ষে বক্তব্য দিলেন রাশিয়ার প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, যদি এই চুক্তি হয়েও থাকে, তবে তা উল্টো নয়াদিল্লির জন্যই লাভজনক হবে। তারা এই ইস্যুতে ভারতীয় বিরোধী দলের সমালোচনাকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।

মস্কো-ভিত্তিক প্রিমাকভ ইনস্টিটিউটের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নতুন চ্যালেঞ্জ বিভাগের প্রধান পিওতর তোপিচকানভ পিটিআইকে বলেন, আমি মনে করি না এখানকার সমালোচনা যুক্তিযুক্ত। যদি জেএফ-১৭-এর জন্য রাশিয়ার ইঞ্জিন সরবরাহের খবর সঠিক হয়, তবে তা আসলে দু'ভাবে ভারতের জন্য উপকারী।

তিনি বলেন,  প্রথমত এটি দেখায় যে চীন এবং পাকিস্তান এখনও রুশ-নির্মিত এই ইঞ্জিনের বিকল্প তৈরি করতে বা প্রতিস্থাপন করতে সক্ষম হয়নি। দ্বিতীয়ত, নতুন এই বিমানটি ভারতের জন্য পরিচিত এবং অনুমানযোগ্য হবে। কারণ সেগুলোর ইঞ্জিন একই এবং ভারত মে ২০২৫ সালের সংকটের (অপারেশন সিন্দুর) সময় জেএফ-১৭ এর অপারেশনাল ব্যবহার পর্যবেক্ষণ করেছে।

তোপিচকানভ স্মরণ করিয়ে দেন যে চীন তাদের এফসি-১  জেটের জন্য আরডি-৯৩ ইঞ্জিন সরবরাহের অনুরোধ করেছিল। সেই সময়ে প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী এবং ড. মনমোহন সিং-এর নেতৃত্বাধীন সরকারগুলোর সময় এনডিএ এবং ইউপিএ সরকার উভয়েই পাকিস্তানে এটি স্থানান্তরের সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল।

তবে, পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক বিশেষজ্ঞ বলেন, এই বিষয়ে আলোচনার কথা তিনি আবছাভাবে মনে করতে পারেন। তার মতে, মস্কো নয়াদিল্লিকে আশ্বস্ত করেছিল আরডি-৯৩ চুক্তিটি ছিল সম্পূর্ণরূপে বাণিজ্যিক, যেখানে কোনো প্রযুক্তি হস্তান্তর  অন্তর্ভুক্ত ছিল না। অন্যদিকে, ভারতকে অনেক উন্নত আরডি-৩৩  ইঞ্জিনের জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তরসহ লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল।

ক্লিমভ প্ল্যান্টে তৈরি আরডি-৯৩ ইঞ্জিনের থ্রাস্ট তার বেস আরডি-৩৩ এর তুলনায় বেশি হলেও এর সার্ভিস লাইফ কম। আরডি-৯৩ এর সার্ভিস লাইফ ২,২০০ ঘণ্টা, যেখানে আরডি-৩৩ এর ৪,০০০ ঘণ্টা।

২০০০ এর দশকের শুরু থেকেই একটি ত্রিপক্ষীয় রাশিয়া-চীন-পাকিস্তান চুক্তির অধীনে রাশিয়া সম্পূর্ণরূপে অ্যাসেম্বল করা আরডি-৯৩ ইঞ্জিন সরবরাহ করে আসছে। পাকিস্তান বর্তমানে এর একটি সংশোধিত সংস্করণ চাচ্ছে, যা এখনও তৈরি হয়নি।

প্রসঙ্গত, সামরিক পরিভাষায় জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমানকে ‘মাল্টি-রোল ফাইটার জেট’ বলা হয়। অর্থাৎ, অনেক উঁচু থেকে হামলা চালানো, মাটির খুব কাছাকাছি নেমে বোমাবর্ষণ করা, প্রতিপক্ষের যুদ্ধবিমানের সঙ্গে আকাশে লড়াই (ডগফাইট), শত্রুর আকাশসীমায় ঢুকে বিপক্ষের ঘাঁটি এবং সমরসজ্জার নির্ভুল খবর নিয়ে আসা— এই সব কাজই করতে পারে এই বিমান।