ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার ঘটনাটি ছিল ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের কয়েক দশকের পরিকল্পনা এবং গত ছয় মাস ধরে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-র দেওয়া আধুনিক প্রযুক্তির এক সমন্বিত ফলাফল। গোয়েন্দা বিশেষজ্ঞ ও সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতে, তেহরানের শাসনব্যবস্থার ‘মাথা’ কেটে ফেলতেই এই অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও প্রাণঘাতী হামলা চালানো হয়েছে।
ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, তেহরানের বিভিন্ন স্থানে শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের একটি বৈঠক চলাকালীন মাত্র ৬০ সেকেন্ডের ব্যবধানে কয়েক দফা হামলা চালানো হয়। এই হামলায় ৮৬ বছর বয়সী খামেনিসহ ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা পরিষদের ৭ জন সদস্য, তাঁর পরিবারের ১২ জন সদস্য এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া এই ঝটিকা অভিযানে দেশটির আরও অন্তত ৪০ জন উচ্চপদস্থ নেতা প্রাণ হারিয়েছেন।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শনিবার সকালে তেহরানের একটি গোপন কম্পাউন্ডে শীর্ষ কর্মকর্তাদের এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের খবর সিআইএ-র মাধ্যমেই ইসরায়েলের কাছে পৌঁছায়। সিআইএ নিশ্চিত করেছিল যে খামেনি সেখানে উপস্থিত থাকবেন।
অন্যদিকে, মোসাদ দীর্ঘ বছর ধরে খামেনির প্রতিদিনের রুটিন, তাঁর খাদ্যাভ্যাস, এমনকি আবর্জনা ফেলার সময় পর্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে একটি বিশাল তথ্যভাণ্ডার গড়ে তুলেছিল। এক সাবেক সিআইএ কর্মকর্তা বলেন, ‘এটি একটি বিশাল ধাঁধার (Jigsaw Puzzle) মতো ছিল। বর্তমান বিশ্বে কেউ কোনো পদচিহ্ন না রেখে চলতে পারে না।’
গোয়েন্দা বিশ্লেষক ইয়োসি মেলম্যান জানান, মোসাদ প্রায় ২০ বছর আগে তাঁদের কৌশলে পরিবর্তন এনেছিল। তাঁরা সরাসরি ইরানের ভেতর থেকেই স্থানীয় এজেন্ট নিয়োগ দেওয়া শুরু করেন। বর্তমান মোসাদ প্রধান ডেভিড বার্নিয়া একটি ‘ফরেন লিজিয়ন’ গঠন করেছেন, যাঁদের পুরো মধ্যপ্রাচ্যে সংবেদনশীল মিশনের জন্য মোতায়েন করা হয়েছে। এই এজেন্টরা আধুনিক প্রযুক্তিতে সজ্জিত হয়ে খামেনির গতিবিধি নজরদারি করছিলেন।
ইসরায়েলি গোয়েন্দা বিভাগের সাবেক প্রধান আমোস ইয়াদলিন এই হামলাকে একটি ‘অপারেশনাল সারপ্রাইজ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। কারণ সবাই ধারণা করেছিল ইসরায়েল রাতের অন্ধকারে হামলা চালাবে। তবে অনেক বিশেষজ্ঞ এই হত্যাকাণ্ডকে ‘কৌশলগত ভুল’ হিসেবেও দেখছেন। ইয়োসি মেলম্যানের মতে, ‘ইসরায়েল হত্যাকাণ্ড পছন্দ করে, কিন্তু আমরা কখনোই শিখি না যে এটিই চূড়ান্ত সমাধান নয়। হামাস বা হিজবুল্লাহর নেতাদের মারার পরও তাঁরা নিঃশেষ হয়ে যায়নি, বরং তাঁদের জায়গা দ্রুত নতুন ও আরও কট্টর নেতারা দখল করে নিয়েছেন।’
বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক যুদ্ধ এখন কেবল ট্যাংক বা বিমানের ওপর নির্ভর করে না; বরং তথ্য (Data), এক্সেস এবং সময়ের (Timing) সঠিক সমন্বয়ই একটি অঞ্চলের মানচিত্র বদলে দিতে পারে। মাত্র এক মিনিটের এই হামলা ইরান তো বটেই, পুরো মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক সমীকরণ ওলটপালট করে দিয়েছে।