ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলী খামেনি গত শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) তেহরানে নিজ কার্যালয়ে এক হামলায় নিহত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ অভিযানের সূত্রে এ ঘটনা ঘটে। পরবর্তী দিন, রোববার (১ মার্চ) সকালে, ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আইআরআইবি নিশ্চিত করে, খামেনি শাহাদাতবরণ করেছেন।
খামেনি ছিলেন ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা। দেশীয় গণমাধ্যম ছাড়াও তিনি নিয়মিত স্থানীয় মসজিদে গিয়ে তাঁর অনুসারীদের উদ্দেশে ভাষণ দিতেন। ছবি ও ভিডিওতে সবসময় দেখা যায়, তিনি ডান হাত ঢেকে রাখতেন। বহু বছরের কৌতূহল জেগেছিল—একজন নেতা এত বছর ধরে কেন ডান হাত লুকিয়ে রাখেন।
এর পেছনে একটি পুরোনো, জীবন-ধ্বংসী ঘটনা নিহিত। ১৯৮১ সালের ২৭ জুন, খামেনি তখন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট। ইরান-ইরাক যুদ্ধের সম্মুখভাগ থেকে ফিরে তিনি এক মসজিদে নামাজ পড়তে যান। নামাজ শেষে অনুসারীদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় একজন যুবক তাঁর সামনে রাখা টেপ রেকর্ডারের বোতাম চাপেন। কিছুক্ষণ পর সেই রেকর্ডার বিস্ফোরিত হয়। ভেতরে লেখা ছিল, ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্রের জন্য ফুরকান গ্রুপের উপহার’।
বিস্ফোরণের তীব্রতা এতটাই ছিল যে খামেনির ডান হাত, কণ্ঠনালি এবং ফুসফুস মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সুস্থ হতে কয়েক মাস লেগেছিল, তবে ডান হাত চিরতরে অবশ হয়ে যায়। ঘটনাস্থলেই তিনি অদম্য সাহসের পরিচয় দিয়ে বলেছিলেন, ‘আমার হাতের প্রয়োজন নেই। মস্তিষ্ক ও জিহ্বা কাজ করলেই যথেষ্ট।‘ এরপর খামেনি বাঁ হাত দিয়ে লেখা শিখে নেন এবং সেই দক্ষতায় তিনি ধর্মীয় নেতৃত্বে আরোহণ করেন।
খামেনি ১৯৮১ থেকে ১৯৮৯ পর্যন্ত দুই মেয়াদে ইরানের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ১৯৮৭ সালে একবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিতে যুক্তরাষ্ট্র সফর করেছিলেন। তবে তত্ত্বাবধায়ক শাসন, ধর্মীয় নেতৃত্ব এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন লোকচক্ষুর অন্তরালে ছিল। তিনি স্ত্রী মানসুরেহ খোজাস্তে বাঘেরজাদেহ ও ছয় সন্তান রেখে গেছেন। নাতি ও ভাগনেদের মধ্যে কেউ কেউ প্যারিসে বসবাস করেন, তবে নিকটতম পরিবার ইরানেই ছিল। সাম্প্রতিক হামলায় তাঁর স্ত্রীও আহত হয়ে পরে মারা গেছেন।
খামেনি টানা ৩৫ বছর ইরান শাসন করেছেন। এই দীর্ঘায়িত শাসন তাঁকে বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘমেয়াদি শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। রাজনীতি ও ধর্মের ক্ষেত্রে তাঁর প্রভাব দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে অব্যাহত থাকলেও, তিনি পশ্চিমা সংস্কৃতি ও পুঁজিবাদের প্রভাবে দেশকে অ্যালার্মের চোখে দেখতেন। তাঁর মতে, পশ্চিমা সংস্কৃতি পশ্চিমা বোমার চেয়েও বিপজ্জনক।
খামেনির যুক্তরাষ্ট্রবিদ্বেষ শুধু আদর্শিক ছিল না; এটি ছিল টিকে থাকার কৌশল। প্রভাবশালী আলেম আহমদ জান্নাতি একবার বলেছিলেন, ‘যদি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ঘেঁষা কেউ ক্ষমতায় আসে, তবে আমাদের সবকিছুকে বিদায় জানাতে হবে।‘ খামেনি নিজেও বিশ্বাস করতেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কখনো স্থায়ী সমঝোতা সম্ভব নয়, তবে তিনি দেশের স্বার্থ ও ‘ইসলামিক রিপাবলিক’ রক্ষা করতে সবসময় কঠোর অবস্থান বজায় রাখতেন।
এবার তাঁর মৃত্যু ইরানের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতৃত্বে এক শূন্যতার সূচনা করেছে। চার দশক ধরে চলা তাঁর শাসন ও বিপ্লবী নীতি নতুন প্রজন্মের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। ইরানের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা, আঞ্চলিক প্রভাব এবং ধর্মীয় নেতৃত্বের পরবর্তী পর্যায় এখন নিখুঁত নজরদারির প্রয়োজন হবে।