যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে চলমান যুদ্ধের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক আধিপত্য ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ছে। তেহরানের এই অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ের মধ্যেই ওই অঞ্চলের অন্যান্য শক্তিগুলোর মধ্যে নতুন মেরুকরণ শুরু হয়েছে। বিশেষ করে, দীর্ঘদিনের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী তুর্কিয়ে (তুরস্ক) এবং ইরাকের সুলায়মানিয়া-ভিত্তিক রাজনৈতিক দল ‘প্যাট্রিয়টিক ইউনিয়ন অব কুর্দিস্তান’ (পিইউকে)-এর মধ্যে বরফ গলার নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
ঐতিহাসিকভাবে তুরস্কের সাথে কুর্দিদের পিইউকে (PUK) দলের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত তিক্ত। এর মূল কারণ ছিল পিইউকে-র সাথে ইরানের ঘনিষ্ঠতা এবং তুরস্কের নিষিদ্ধ সংগঠন পিকেকে (PKK)-কে সমর্থনের অভিযোগ। তবে বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ইরান কোণঠাসা হয়ে পড়ায় সেই পুরোনো হিসাব বদলে যাচ্ছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আঙ্কারা এবং সুলায়মানিয়ার মধ্যে সম্পর্কের এক নতুন ‘উইন্ডো’ বা সুযোগ তৈরি হয়েছে।
২০২৪ সালের শেষ দিক থেকে শুরু হওয়া তুরস্কের অভ্যন্তরীণ শান্তি প্রক্রিয়া এবং ২০২৫ সালের জুলাই মাসে সুলায়মানিয়ায় পিকেকে-র নিরস্ত্রীকরণ অনুষ্ঠানে পিইউকে-র মধ্যস্থতা আঙ্কারাকে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। এছাড়া, গত অক্টোবর মাসে সুলায়মানিয়ার ওপর থেকে দীর্ঘ দুই বছরের বিমান নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নিয়েছে তুরস্ক। এই পদক্ষেপগুলো দুই পক্ষের মধ্যে বিশ্বাস তৈরির প্রাথমিক ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বর্তমান যুদ্ধে পিইউকে এক কঠিন কৌশলগত অবস্থানের মুখোমুখি। একদিকে তারা দীর্ঘকাল ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র, অন্যদিকে প্রতিবেশী ইরানের সাথে তাদের রয়েছে গভীর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক। পিইউকে নেতা বাফেল তালবানি ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘কুর্দিস্তান অঞ্চলকে কোনো যুদ্ধের ময়দান নয়, বরং একটি ‘সেতু’ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।’
তেহরান ইতোমধ্যেই পিইউকে-কে হুঁশিয়ারি দিয়েছে যাতে তারা তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ইরানি কুর্দিদের বিদ্রোহে মদদ না দেয়। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল চাইছে কুর্দিদের মাধ্যমে ইরানের ভেতরে অস্থিরতা তৈরি করতে। এই পরিস্থিতিতে পিইউকে যদি ইরানের প্রভাব বলয় থেকে কিছুটা সরে এসে তুরস্কের সাথে সম্পর্ক জোরদার করে, তবে তা মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক বড় পরিবর্তন আনবে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধের ফলাফল যাই হোক না কেন, মধ্যপ্রাচ্যের তথাকথিত ‘ধূসর এলাকা’ (Gray Area) বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। পিইউকে এবং তুরস্কের এই সম্ভাব্য মৈত্রী তেহরানের জন্য যেমন বড় ধাক্কা হবে, তেমনি আঙ্কারার জন্য মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বাড়ানোর এক অভাবনীয় সুযোগ তৈরি করবে।