যুক্তরাষ্ট্র বলছে শান্তি আলোচনা ‘ফলপ্রসূ’ হচ্ছে, অন্যদিকে ইরান বলছে ‘কোনো আলোচনাই হচ্ছে না’। মধ্যপ্রাচ্যের এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সমীকরণ এখন এক গোলকধাঁধায় রূপ নিয়েছে। পাকিস্তানসহ বিভিন্ন মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদান চললেও দুই পক্ষের দাবি ও লক্ষ্য এখন আকাশ-পাতাল ব্যবধানে। বিবিসির নিরাপত্তা বিশ্লেষক ফ্রাঙ্ক গার্ডনারের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই যুদ্ধের নেপথ্যের আসল চাওয়া-পাওয়া।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যখন এই যুদ্ধ শুরু হয়, ওয়াশিংটন ও জেরুজালেমের মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের ইসলামি শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানো অথবা তেহরানকে এমনভাবে পঙ্গু করে দেওয়া যাতে তারা আমেরিকার সব শর্ত মেনে নিতে বাধ্য হয়। ইসরায়েলি গণমাধ্যমে প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের ১৫ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে:
- ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করা।
- ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বাতিল।
- হিজবুল্লাহ, হুতি ও হামাসের মতো ‘প্রক্সি’ গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দেওয়া বন্ধ করা।
বিনিময়ে ইরানকে দেওয়া হবে নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি এবং হরমুজ প্রণালীতে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ।
ইরান শুরুতেই মার্কিন প্রস্তাবকে ‘অত্যধিক’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। তেহরান এখন নিজেকে আগের চেয়ে কৌশলগতভাবে শক্তিশালী মনে করছে, কারণ তারা বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের ধমনী ‘হরমুজ প্রণালী’র ওপর কার্যত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। ইরানের ৫টি প্রধান শর্ত হলো:
- যুদ্ধের কারণে হওয়া ক্ষয়ক্ষতির জন্য ‘যুদ্ধ-ক্ষতিপূরণ’ (Reparations) প্রদান।
- হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের সার্বভৌম অধিকারের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।
- ভবিষ্যতে আর কখনো আক্রান্ত হবে না—এমন গ্যারান্টি।
- বাহরাইন থেকে মার্কিন পঞ্চম নৌ-বহরের বিদায় এবং ইরানকে ‘উপসাগরীয় পুলিশ’ হিসেবে স্বীকৃতি।
সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলো এখন চরম আতঙ্কে। তারা ভেবেছিল মার্কিন হামলায় হয়তো ইরান দ্রুত নতি স্বীকার করবে। কিন্তু বাস্তবে ইরান এখন আরও ক্ষিপ্ত হয়ে প্রতিবেশীদের ওপর ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে। হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তাতে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে—আর এটিই ইরানের সবচেয়ে বড় শক্তি।
মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ (HRANA)-এর তথ্যমতে, এই যুদ্ধে ইরানে এ পর্যন্ত অন্তত ৩,২৯১ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ১,৪৫৫ জনই সাধারণ বেসামরিক নাগরিক। যুদ্ধের তীব্রতা বাড়াতে এবং তেহরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে আমেরিকা এখন আরও ৫,০০০ মেরিন সেনা এবং ৮২তম এয়ারবর্ন ডিভিশনের প্যারাট্রুপার পাঠাচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি এখন অনেকটা ইউক্রেন যুদ্ধের মতো ‘লগজ্যাম’ বা অচলাবস্থায় রূপ নিয়েছে। ট্রাম্প যত বেশি বলছেন ইরান আলোচনার জন্য মরিয়া, ইরান তত বেশি অনমনীয় হয়ে উঠছে। সময় ও ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে ইরান এই যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করতে চায়, যাতে জ্বালানি সংকটে বিশ্ব অর্থনীতি পঙ্গু হয়ে পড়ে।