হরমুজ প্রণালিতে কেনো পূর্ণ সার্বভৌমত্ব চায় ইরান

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক নৌপথ হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরান ও পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। সম্প্রতি তেহরান তাদের ওপর পরিচালিত আগ্রাসন বন্ধের শর্ত হিসেবে যে তালিকা পেশ করেছে, তাতে প্রথমবারের মতো যোগ করা হয়েছে এক অভাবনীয় দাবি হরমুজ প্রণালিতে ইরানের পূর্ণ সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি। এই দাবি কেবল একটি জলপথের নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি রাজনীতি এবং বিশ্ব অর্থনীতির ওপর ইরানের একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার এক উচ্চাভিলাষী প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ২০ শতাংশ বা এক-পঞ্চমাংশ এই সরু প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরান এখন এই ভৌগোলিক অবস্থানকে তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এই জলপথকে বছরে শত কোটি ডলার আয়ের একটি স্থায়ী উৎসে পরিণত করার পরিকল্পনা করছে।

ব্লুমবার্গ ইকোনমিকসের দিনা এসফানদারিয়ারি মনে করেন, ইরান নিজেই তাদের এই কৌশলের অভাবনীয় সাফল্যে বিস্মিত। তিনি জানান, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে ধুঁকতে থাকা অর্থনীতির ঘাটতি মেটাতে ইরান এই টোল ব্যবস্থাকে একটি ‘সহজ ও কম খরচের’ বিকল্প হিসেবে দেখছে। হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল এই পথ দিয়ে যায়। প্রতি ট্যাংকারের জন্য যদি ২০ লাখ ডলার ফি নির্ধারণ করা হয়, তবে ইরান কেবল তেল থেকে মাসে প্রায় ৬০ কোটি ডলার আয় করতে পারবে। এলএনজি পরিবহন যুক্ত করলে এই আয় মাসে ৮০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে, যা মিসরের সুয়েজ খালের আয়ের প্রায় সমান।

ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি তার প্রথম বক্তব্যেই হরমুজ প্রণালির কৌশলগত গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, এই জলপথ বন্ধ করে দেওয়ার সক্ষমতা ইরানকে বৈশ্বিক দরকষাকষিতে সুবিধাজনক অবস্থানে রাখবে। ইরানের আইনপ্রণেতারা বর্তমানে একটি বিল পাসের প্রক্রিয়া চালাচ্ছেন, যার মাধ্যমে শত্রুভাবাপন্ন দেশগুলোর জাহাজ থেকে টোল আদায় বা তাদের চলাচল সীমিত করা হবে।

ইরানের এই দাবিকে আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা। মার্কিন নেভাল ওয়ার কলেজের অধ্যাপক জেমস ক্রাস্কা বলেন, জাতিসংঘ সমুদ্র আইন (UNCLOS) অনুযায়ী, হরমুজ একটি আন্তর্জাতিক প্রণালি। এখানে কোনো উপকূলীয় রাষ্ট্রের একক টোল আদায়ের অধিকার নেই। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই পদক্ষেপকে ‘বিপজ্জনক ও অগ্রহণযোগ্য’ আখ্যা দিয়ে বলেছেন, এটি বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য বড় ধরনের হুমকি।

লয়েডস লিস্টের তথ্য অনুযায়ী, ইতোমধ্যে ইরান উপকূলের কাছে একটি নতুন করিডোর দিয়ে জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে। অন্তত ২০টি জাহাজ এই পথ ব্যবহার করেছে এবং ধারণা করা হচ্ছে, নিরাপদ চলাচলের নিশ্চয়তা পেতে কিছু জাহাজ ইতোমধ্যে ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত ফি পরিশোধ করেছে। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড (IRGC) একটি নতুন নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু করেছে, যা কার্যকরভাবে এই নৌপথের ওপর তেহরানের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরালো করছে।

পরিশেষে, ইরানের এই দাবি কেবল যুদ্ধের অংশ নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখার একটি নীল নকশা। যদি বিশ্বশক্তিগুলো এর কোনো স্থায়ী সমাধান না করতে পারে, তবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার চিরস্থায়ী অস্থিরতার মুখে পড়তে পারে। সূত্র: সিএনএন