আমাল সুবেইহ-এর কাছে ২০২৫ সালের ৭ মে ছিল একই সঙ্গে জীবনের সবচেয়ে আনন্দের এবং সবচেয়ে ভয়াবহ দিন। সেদিনই জন্ম নিয়েছিল তার কন্যাসন্তান সানা, আর কয়েক ঘণ্টা পরই ইসরায়েলি হামলায় নিহত হন তার স্বামী, সাংবাদিক ইয়াহিয়া সুবেইহ।
ভোর ছয়টার দিকে প্রসববেদনা নিয়ে আমালকে হাসপাতালে নিয়ে যান ইয়াহিয়া। চারদিকে তখনও চলছিল গাজা উপত্যকা জুড়ে ইসরায়েলের ভয়াবহ সামরিক অভিযান। কিন্তু যুদ্ধ, আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার মধ্যেও নিজেদের তৃতীয় সন্তানকে ঘিরে দম্পতির মনে ছিল সীমাহীন আনন্দ ও স্বপ্ন।
দুই ছেলে বারাআ ও কেনানের পর প্রথম কন্যাসন্তানকে বুকে নিয়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন ইয়াহিয়া। আমালের ভাষায়, 'সে বারবার বলছিল- ‘আমার সুন্দর রাজকন্যা এসেছে।’ নবজাতক মেয়েকে কোলে নেওয়া, তার কানে আজান দেওয়া, ছবি তোলা, আত্মীয়দের অভিনন্দন গ্রহণ' সবকিছুতেই ছিল এক বাবার নিখাদ আনন্দ।
হাসপাতাল ছাড়ার আগে ইয়াহিয়া স্ত্রীকে বলেছিলেন, বাসায় গিয়ে দুই ছেলেকে দেখে কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস এনে দ্রুত ফিরে আসবেন। কিন্তু সেটিই ছিল তাদের শেষ দেখা। সন্তানের জন্মের মাত্র পাঁচ ঘণ্টা পর মধ্য গাজা সিটির একটি বাণিজ্যিক এলাকায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত হন ইয়াহিয়া। হামলায় অন্তত ১৭ জন নিহত ও বহু মানুষ আহত হন।
হাসপাতালে থাকা আমালকে প্রথমে কেউ খবরটি বলতে সাহস পাননি। সদ্য অস্ত্রোপচার শেষে শারীরিক ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়া অবস্থায় থাকা এই মাকে কীভাবে এমন সংবাদ দেওয়া যায়, তা নিয়ে দ্বিধায় ছিলেন স্বজনরা। কিন্তু চারপাশের অস্বাভাবিক আচরণে কিছু একটা ঘটেছে বুঝতে পারেন তিনি। বারবার ফোন করেও স্বামীর কোনো সাড়া না পেয়ে আতঙ্ক বাড়তে থাকে। পরে ইন্টারনেটে খবরটি দেখেই ভেঙে পড়েন আমাল।
তার ভাষায়, 'শিরোনামটা চোখের সামনে ভেসে উঠল, ‘নবজাতক কন্যাকে স্বাগত জানানোর পাঁচ ঘণ্টা পর নিহত সাংবাদিক ইয়াহিয়া সুবেইহ।’ মনে হয়েছিল শরীরের রক্ত যেন জমে গেছে। আমি চিৎকার করে কাঁদছিলাম, বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না।'
জানা যায়, মেয়ের জন্ম উপলক্ষে আত্মীয়স্বজনের মধ্যে মিষ্টি বিতরণ করতে গিয়েছিলেন ইয়াহিয়া। সেই সময়ই হামলার শিকার হন তিনি। নিহতদের মধ্যে ছিলেন তার চাচাতো ভাই, ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও শ্যালক, যারা কয়েক ঘণ্টা আগেই হাসপাতালে এসে নবজাতক শিশুকে কোলে নিয়েছিলেন। আমাল বলেন, সবচেয়ে কষ্টের বিষয় ছিল শেষবারের মতো স্বামীকে দেখতে না পারা। অস্ত্রোপচারের কারণে তিনি হাসপাতালের বেড ছেড়ে উঠতেও পারেননি।
যুদ্ধের এই সময়ে স্বামী হারানোর আগেই তিনি হারিয়েছেন নিজের ভাই, ভাবি ও তাদের তিন সন্তানকে। হারিয়েছেন নিজের বোন ও তার চার সন্তানকেও। তবু ইয়াহিয়ার মৃত্যুর পরের সময়টাকেই তিনি 'শোকের বছর' বলে বর্ণনা করেন।
স্বামীর মৃত্যুর কয়েক মাস পর তিন সন্তানকে নিয়ে দক্ষিণ গাজায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হন আমাল। একটি তাঁবুতে চার মাস বয়সী শিশু ও দুই ছোট সন্তানকে নিয়ে বেঁচে থাকার সংগ্রামকে তিনি বর্ণনা করেন অসহনীয় হিসেবে।তার ভাষায়, 'ইয়াহিয়া ছিল আমাদের ভরসা। যুদ্ধের মধ্যেও সে সন্তানদের জন্য খাবার জোগাড় করত। এমন পরিস্থিতিতে তাকে হারানো ছিল অকল্পনীয় যন্ত্রণা।'
ক্রমে সন্তানদের জন্য নিজেকেই মা ও বাবা, দুই ভূমিকায় দাঁড় করাতে হয় আমালকে। স্বামীর স্মৃতি ও আদর্শ ধরে রাখতে তিনি এখন সেই একই সংবাদমাধ্যমে কাজ করছেন, যেখানে কাজ করতেন ইয়াহিয়া। সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয় ছোট্ট সানাকে দেখে। মেয়েটি এখন এক বছরে পা দিয়েছে, অথচ বাবাকে কখনো চিনতেই পারেনি। আমাল বলেন, 'আমি ওর মুখে ওর বাবাকে খুঁজে পাই, হাসিতে, চেহারায়, এমনকি আমি কাঁদলে যেভাবে এসে জড়িয়ে ধরে, তাতেও।'
মেয়ের প্রথম জন্মদিন পালন নিয়েও দ্বিধায় ছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত একটি ছোট কেক, কিছু মিষ্টি আর পাশে রাখা স্বামীর ছবিকে নিয়েই জন্মদিন পালন করার সিদ্ধান্ত নেন। কারণ, তার বিশ্বাস, যুদ্ধ সবকিছু কেড়ে নিলেও স্মৃতি, ভালোবাসা আর বেঁচে থাকার ইচ্ছাকে শেষ করে দিতে পারে না। সূত্র: আলজাজিরা