যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ তুলে নিজেদের কঠোর ও অনড় অবস্থানের কথা আবারও জোরালোভাবে পুনর্ব্যক্ত করেছে ইরান। তেহরান স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে, দেশের জাতীয় নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা কৌশল এবং পারমাণবিক কর্মসূচি সংক্রান্ত বিষয়ে কখন, কীভাবে এবং কোন মাত্রায় পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সেই সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে ইরানের নিজস্ব বিষয়। এ ক্ষেত্রে বাইরের কোনো চাপ, পরামর্শ বা হস্তক্ষেপ গ্রহণের প্রশ্নই ওঠে না বলেও ইঙ্গিত দিয়েছে দেশটি।
সোমবার (১ জুন) ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এক বিস্তারিত বিবৃতিতে বলেন, যেসব রাষ্ট্র নিজেদের ভূখণ্ড, সামরিক ঘাঁটি বা অন্যান্য অবকাঠামো কোনো তৃতীয় দেশের বিরুদ্ধে হামলা পরিচালনার কাজে ব্যবহারের সুযোগ দেয়, তারা আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক দায়িত্ব ও বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন করে। কুয়েতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার খবর প্রকাশের পর দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় তিনি এ মন্তব্য করেন।
বাঘাই বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনায় ব্যবহৃত আঞ্চলিক ঘাঁটি ও সম্পদের বিষয়ে তেহরানের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট। দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে তার উপযুক্ত ও প্রয়োজনীয় জবাব দেওয়ার অধিকার ইরানের রয়েছে।
একই সঙ্গে তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের অবস্থানেরও কঠোর সমালোচনা করেন। বাঘাইয়ের অভিযোগ, আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইরানের বিরুদ্ধে নিন্দা ও সমালোচনা করা হলেও যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের ক্ষেত্রে একই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। তাঁর ভাষায়, এ ধরনের অবস্থান দায়িত্বজ্ঞানহীন, ভারসাম্যহীন এবং স্পষ্টতই দ্বিমুখী মানসিকতার প্রতিফলন।
এর আগে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এক বিবৃতিতে কুয়েতে হামলার ঘটনাকে দেশটির সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি এবং পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেছিল।
সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে বাঘাই আরও জানান, বর্তমানে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো কারিগরি, প্রযুক্তিগত বা বিস্তারিত পর্যায়ের আলোচনা চলছে না। তিনি বলেন, পারমাণবিক বিষয়ে কখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং কোন পর্যায়ে কী পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন, সে বিষয়ে তেহরান সম্পূর্ণ সচেতন। এই মুহূর্তে তাদের প্রধান অগ্রাধিকার হলো চলমান সংঘাতের অবসান এবং পরিস্থিতির আরও অবনতি রোধ করা।
তবে একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার কথা থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে তা লঙ্ঘন করে চলেছে। ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা, আঞ্চলিক স্বার্থ এবং সার্বভৌম অধিকার রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও সতর্কবার্তা দেন তিনি।
অন্যদিকে মার্কিন সেনাবাহিনী ইরানের গোরুক শহর ও কেশম দ্বীপে অবস্থিত রাডার এবং ড্রোন-সংক্রান্ত স্থাপনায় হামলা চালানোর কথা স্বীকার করেছে। ওয়াশিংটন এসব অভিযানকে আত্মরক্ষামূলক এবং প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
এদিকে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ও জ্যেষ্ঠ আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি চুক্তি অমান্যের অভিযোগ তুলেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা এবং ইসরায়েলকে লেবাননে সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখা থেকে বিরত না রাখার মধ্য দিয়েই চুক্তি লঙ্ঘনের সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে।
গালিবাফের দাবি, এসব পদক্ষেপ শুধু উত্তেজনা কমাতে ব্যর্থ হচ্ছে না, বরং পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল, অস্থিতিশীল এবং অনিশ্চিত করে তুলছে। তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নেওয়া প্রতিটি সিদ্ধান্তেরই একটি মূল্য রয়েছে এবং সময়মতো সেই মূল্য পরিশোধ করতেই হয়। তাঁর ভাষায়, কোনো পদক্ষেপই ফলাফলবিহীন থাকে না, এবং শেষ পর্যন্ত সবকিছুরই পরিণতি সামনে এসে দাঁড়ায়। সূত্র: আলজাজিরা