ইরানের রণকৌশলে হরমুজের পর এবার লোহিত সাগর

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করার পর এবার লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার বাব আল-মান্দেব প্রণালিকেও নতুন কৌশলগত চাপের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করার ইঙ্গিত দিচ্ছে ইরান। ইয়েমেনের মিত্র হুথি আন্দোলনের মাধ্যমে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে বিঘ্ন সৃষ্টি করে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর চাপ বাড়ানোর কৌশল নিতে পারে তেহরান বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলা ইরানের অভ্যন্তরে আরও গভীর হওয়ার পাশাপাশি হুথিদের হামলাও বাড়তে থাকায় সংঘাত এখন শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকেও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হচ্ছে।

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হরমুজ প্রণালিতে প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা ইতোমধ্যেই দেখিয়েছে ইরান। এখন বাব আল-মান্দেব প্রণালিকেও দ্বিতীয় চাপের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে সংযুক্ত করা এই প্রণালি দিয়েই সৌদি আরবের তেল রপ্তানির বড় অংশ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম প্রেস টিভির বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ইয়েমেনের হুথি রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য মোহাম্মদ আল-ফারাহ সতর্ক করে বলেছেন, সৌদি আরব যদি ইয়েমেনে হামলা অব্যাহত রাখে, তবে বাব আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে। তার দাবি, এমন পরিস্থিতিতে হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব উভয় প্রণালিই একযোগে অচল হয়ে যেতে পারে এবং তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষক ফাওয়াজ গারজেস রয়টার্সকে বলেন, ইরান ওয়াশিংটনকে বোঝাতে চাইছে যে শুধু হরমুজ নয়, বাব আল-মান্দেবও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এতে দ্বিপক্ষীয় সামরিক সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি ও সমুদ্রপথের নিরাপত্তার সংকটে রূপ নিতে পারে।

মার্কিন কূটনীতিক ও সাবেক মধ্যপ্রাচ্য শান্তি আলোচক ডেনিস রসের মতে, এখন যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য হচ্ছে এমন পরিস্থিতি তৈরি করা যাতে ইরান আবার আলোচনার টেবিলে ফিরে আসে এবং একটি গ্রহণযোগ্য সমঝোতায় পৌঁছাতে রাজি হয়।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০২৩ সালের গাজা যুদ্ধের পর হুথিরা লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়ে ইতোমধ্যেই বৈশ্বিক বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছিল। সে সময় বহু শিপিং কোম্পানি আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে বিকল্প পথে চলাচল করতে বাধ্য হয়, যার ফলে পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। পরে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য হুথিদের অবস্থানে বিমান হামলা চালায় এবং আন্তর্জাতিক নৌ-জোট গঠন করে ওই রুটে নিরাপত্তা নিশ্চিতের চেষ্টা করে।

কিংস কলেজ লন্ডনের নিরাপত্তা বিশ্লেষক আন্দ্রেয়াস ক্রিগের ভাষায়, হরমুজের পর বাব আল-মান্দেব ইরানের হাতে থাকা আরেকটি ‘চূড়ান্ত কৌশলগত অস্ত্র’। তবে তিনি মনে করেন, পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠলেই কেবল তেহরান এই পথ বেছে নিতে পারে।

অন্যদিকে সৌদি-ভিত্তিক গালফ রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান আবদুল আজিজ সাগের বলেন, হুথিদের এখনো বাব আল-মান্দেবে নৌ চলাচল ব্যাহত করার সক্ষমতা রয়েছে। তবে তেহরানের সরাসরি নির্দেশনা ছাড়া তারা বড় ধরনের পদক্ষেপ নেবে, এমন সম্ভাবনা কম। তার মতে, যদি হুথিরা আন্তর্জাতিক নৌপথে বড় ধরনের হামলা চালায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা আরও বিস্তৃত সামরিক প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব, বিশ্বের দুই গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডরকে ঘিরে উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। সূত্র: রয়টার্স