কার হাতে ইরানের আসল নেতৃত্ব

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশটির রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্র কোথায়, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার দাবি করেছেন, ইরানে এখন কে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, সেটি দেশটির নেতারাও জানেন না। তবে তেহরান এই দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে।

মার্কিন প্রশাসন ইরানের নেতৃত্বকে বিভক্ত ও অস্থির হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করলেও, ইরানি কর্তৃপক্ষ বলছে, রাষ্ট্রীয় নীতির ক্ষেত্রে তারা ঐক্যবদ্ধ অবস্থানেই রয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এবং সেখানে চলাচলকারী জাহাজের বিষয়ে ইরানের অবস্থান নির্ধারণে সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব একই অবস্থানে রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, চলমান সংঘাতের মধ্যে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) বা বিপ্লবী গার্ডের প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা, সামরিক কৌশল এবং প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপে এই বাহিনীর শীর্ষ কমান্ডাররাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।

আইআরজিসির প্রধান আহমদ ভাহিদি, যৌথ যুদ্ধকালীন কমান্ডের প্রধান আলি আবদুল্লাহি এবং আইআরজিসি নৌবাহিনীর নতুন প্রধান আলি আজমাই সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে একাধিকবার প্রকাশ্যে এসেছেন। তারা প্রত্যেকেই হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কৌশলগত অবস্থান অটুট রাখার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ অব্যাহত রাখার কথা বলেছেন।

এদিকে সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সমন্বয়কের দায়িত্বে থাকা মোহাম্মদ বাকের জোলঘাদরও নিরাপত্তা ও সামরিক নীতির সমন্বয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, সামরিক সক্ষমতা অক্ষুণ্ন রেখেই কেবল কূটনৈতিক আলোচনায় বসতে রাজি ইরান। একই সঙ্গে তিনি হরমুজ প্রণালিতে আইআরজিসির উপস্থিতিকে দেশের কৌশলগত সম্পদ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সরকারের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করলেও সামরিক-নিরাপত্তা নেতৃত্বের তুলনায় তার প্রভাব তুলনামূলক কম বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। তা সত্ত্বেও তিনি সরকার ও সামরিক বাহিনীর মধ্যে কোনো বিভক্তি নেই বলে জোর দিয়ে আসছেন। সম্প্রতি এক বৈঠকে তিনি বলেন, সামরিক কমান্ডারদের থেকে নিজেকে আলাদা মনে করেন না এবং তাদের পাশে থাকাকে নিজের দায়িত্ব ও সম্মানের বিষয় হিসেবে দেখেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এখনও কূটনৈতিক তৎপরতার মুখ্য মুখ হিসেবে কাজ করছেন। তিনি বারবার অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র দুই দেশের মধ্যে হওয়া সমঝোতা স্মারকের একাধিক ধারা লঙ্ঘন করেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি, লেবানন এবং তেল-সংক্রান্ত বিষয়ে ওয়াশিংটনের ভূমিকার সমালোচনা করে আসছেন তিনি।

এদিকে পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফকে আলোচনার প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হলেও, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় তাকে কট্টরপন্থি অংশের সমালোচনার মুখেও পড়তে হয়েছে।

ইরানের সবচেয়ে কট্টরপন্থি রাজনৈতিক গোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত পায়দারি ফ্রন্ট এখনো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো ধরনের ছাড় বা সমঝোতার বিরোধিতা করছে। এই গোষ্ঠীর প্রভাব সংসদ ও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমেও রয়েছে। সম্প্রতি সংসদে অনুষ্ঠিত অধিবেশনেও হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা এবং সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।

ইরানের সংবিধান অনুযায়ী সর্বোচ্চ নেতা রাষ্ট্রের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। খামেনির মৃত্যুর পর তার ছেলে মোজতবা খামেনি নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। যদিও তিনি জনসমক্ষে খুব কমই উপস্থিত হন, তবুও সামরিক ও নিরাপত্তা নেতৃত্বের সমর্থন তার প্রতি রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে পর্যবেক্ষকদের মতে, মোজতবা খামেনি এখনো তার বাবার মতো সর্বময় রাজনৈতিক প্রভাব প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্র অনেকটাই সামরিক-নিরাপত্তা নেতৃত্ব এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের সমন্বিত কাঠামোর ওপর নির্ভর করেই পরিচালিত হচ্ছে। সূত্র: আলজাজিরা