সৌদি-যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক চুক্তিতে মধ্যপ্রাচ্যে অস্ত্র প্রতিযোগিতার শঙ্কা

যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যে হওয়া নতুন বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তিকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সৌদি আরবকে ভবিষ্যতে নিজস্ব ভূখণ্ডে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সুযোগ দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্লেষকদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

চুক্তির সবচেয়ে বিতর্কিত দিক হলো, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) তুলনামূলক কম তদারকির মধ্যে ভবিষ্যতে সৌদি আরবকে নিজস্ব মাটিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সুযোগ দেওয়ার সম্ভাবনা। যদিও এই প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগে যৌথ মার্কিন-সৌদি দলকে এর প্রয়োজনীয়তা ও বাণিজ্যিক সক্ষমতা যাচাই করতে হবে।

ইরানে বিষয়টি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। তেহরানের কর্মকর্তারা প্রশ্ন তুলেছেন, সৌদি আরব যদি পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জনের সুযোগ পায়, তাহলে ইরানকে কেন একই সুযোগ দেওয়া হবে না।

ইরানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আলী জেইনিভান্দ বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হলে অন্য যে কোনো দেশের তুলনায় ইরানের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দ্বৈত নীতির অভিযোগ এনে বলেন, ওয়াশিংটন একদিকে কিছু দেশকে পারমাণবিক কর্মসূচির অনুমতি দেয়, অন্যদিকে অন্য দেশকে তা থেকে বিরত রাখতে যুদ্ধ পর্যন্ত করে।

ইরানের কট্টরপন্থী দৈনিক হামশাহরিও যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করে বলেছে, শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচির জন্য ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়েও ওয়াশিংটন সৌদি আরবকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সুযোগ দিচ্ছে, যা পারমাণবিক বিস্তারের ঝুঁকি বাড়াবে।

অন্যদিকে ইসরায়েল এই চুক্তিকে এখনো চূড়ান্ত বলে মনে করছে না। দেশটির কর্মকর্তারা আশা করছেন, হোয়াইট হাউস ও মার্কিন কংগ্রেসের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে চুক্তির বিভিন্ন দিক প্রভাবিত করা সম্ভব হবে।

ইসরায়েলের উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সৌদি আরবের সম্ভাব্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি। দেশটির বিশ্লেষকদের মতে, এটি মধ্যপ্রাচ্যে একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত, তুরস্ক ও মিসরের মতো দেশগুলোকেও একই ধরনের অধিকার দাবি করতে উৎসাহিত করতে পারে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত ২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি করেছিল, সেখানে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও জ্বালানি পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের অধিকার ত্যাগ করায় সেটিকে দীর্ঘদিন ধরে ‘স্বর্ণমান’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। তবে ওই চুক্তিতে এমন একটি ধারা রয়েছে, যার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের অন্য কোনো দেশ উন্নত শর্ত পেলে আবুধাবিও চুক্তি পুনর্বিবেচনার সুযোগ পাবে।

এদিকে মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট দাবি করেছেন, সৌদি-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তিটি পারমাণবিক নিরাপত্তা ও বিস্তাররোধের সর্বোচ্চ মান বজায় রেখেই করা হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, সম্ভাব্য সমৃদ্ধকরণ স্থাপনা যুক্তরাষ্ট্র নির্মাণ করবে এবং সংবেদনশীল প্রযুক্তি সৌদি আরবের কাছে হস্তান্তর করা হবে না। পাশাপাশি অন্তত ১০ বছর সৌদি আরব নিজস্ব সমৃদ্ধকরণ প্রযুক্তি তৈরি বা অন্য কোনো দেশ থেকে তা সংগ্রহ করতে পারবে না।

মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিক প্রতিযোগিতার আশঙ্কা নতুন নয়। ২০১৮ সালে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বলেছিলেন, ইরান যদি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করে, তাহলে সৌদি আরবও যত দ্রুত সম্ভব একই পথে হাঁটবে।

পরের বছর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি মন্তব্য করেছিলেন, সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর হওয়ায় ওয়াশিংটনের তাদের জন্য পারমাণবিক স্থাপনা নির্মাণে কোনো আপত্তি নেই। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেছিলেন, ভবিষ্যতে এসব স্থাপনা ‘ইসলামিক মুজাহিদদের’ নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। ছবি: সিএনএন