ইসরায়েলের হামলার লক্ষ্যবস্তু হওয়া সিরিয়ার আবু দাহুর বিমানঘাঁটিতে তুরস্কের সামরিক কর্মকর্তারা সফর করলেও সেখানে তুর্কি সেনা মোতায়েনের কোনো পরিকল্পনা ছিল না বলে জানিয়েছেন সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ হাসান আল-শাইবানি। একই সঙ্গে যেকোনো দেশের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা ও জোট গড়ার অধিকার সিরিয়ার রয়েছে বলেও স্পষ্ট করেছেন তিনি।
অ্যাক্সিওসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আল-শাইবানি বলেন, আবু দাহুর ঘাঁটিতে তুর্কি কর্মকর্তাদের সফর ছিল দুই দেশের চলমান সামরিক সহযোগিতারই অংশ। প্রশিক্ষণ ও সামরিক অভিজ্ঞতা বিনিময়ের আওতায় ওই সফর হয়েছে বলে জানান তিনি।
তার দাবি, ঘাঁটিটিতে তুর্কি সেনা মোতায়েনের মতো কোনো সামরিক প্রস্তুতি ছিল না, যা ইসরায়েলের হামলার কারণ হিসেবে দেখানো যেতে পারে। বরং হামলার সময় ঘাঁটিটি অনেকটাই ফাঁকা ছিল এবং সেটি পুরোপুরি পুনর্বাসন বা কার্যকর করার কাজও শেষ হয়নি।
আল-শাইবানি বলেন, ঘাঁটিতে তখনো পুনর্বাসনের কাজ চলছিল। ফলে সেখানে তুর্কি সামরিক উপস্থিতির সঙ্গে ইসরায়েলি হামলাকে সরাসরি যুক্ত করার মতো বাস্তব পরিস্থিতি ছিল না।
সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্য আসে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর পাল্টা দাবির পর। নেতানিয়াহু বলেছেন, সিরিয়ায় তুরস্কের যেকোনো সামরিক তৎপরতার বিরুদ্ধে ইসরায়েল আগেই সতর্ক করেছিল। এরপরই মঙ্গলবার (১৭ আগস্ট) আবু দাহুর বিমানঘাঁটিতে হামলা চালানো হয়।
ইসরায়েলের দাবি, সিরিয়া সেখানে তুর্কি সেনা মোতায়েনের অনুমতি দিয়ে নিরাপত্তা বিষয়ে বিদ্যমান সমঝোতার সীমা লঙ্ঘনের পথে এগোচ্ছিল। সেই কারণেই ঘাঁটিটিকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
তবে দামেস্ক এই ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করেছে। আল-শাইবানি বলেন, সিরিয়া বর্তমানে এক দশকেরও বেশি সময়ের গৃহযুদ্ধ এবং ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পর সামরিক ও বেসামরিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে।
এই পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে প্রশিক্ষণ ও সামরিক সহযোগিতা প্রয়োজন বলেও জানান তিনি। শুধু তুরস্ক নয়, সৌদি আরব, জর্ডান, কাতার ও রাশিয়ার সঙ্গেও একই ধরনের সহযোগিতা রয়েছে বলে উল্লেখ করেন সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
আল-শাইবানি বলেন, সিরিয়া একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র এবং তুরস্কসহ যেকোনো দেশের সঙ্গে সহযোগিতা ও জোট গড়ে তোলার অধিকার তার রয়েছে।
এদিকে তুরস্কও আবু দাহুর ঘাঁটিতে তাদের কোনো সামরিক উপস্থিতি থাকার কথা অস্বীকার করেছে। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা সাংবাদিকদের বলেন, ইসরায়েলের হামলার আগে কিংবা হামলার সময় ঘাঁটিতে কোনো তুর্কি সামরিক প্রতিনিধিদল ছিল না। একই সঙ্গে সিরিয়ার সার্বভৌমত্বের প্রতি তুরস্কের দৃঢ় সমর্থন অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।
তবে ঘটনাটিকে ঘিরে পরস্পরবিরোধী তথ্য সামনে এসেছে। সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস দাবি করেছে, হামলার আগে ঘাঁটিতে একটি তুর্কি সামরিক প্রতিনিধিদল সফর করেছিল। কয়েকজন সিরীয় কর্মকর্তাও তুর্কি কর্মকর্তাদের সাম্প্রতিক সফরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বলে জানিয়েছে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস।
ইসরায়েলের সঙ্গে সিরিয়ার নতুন সরকারের টানাপোড়েনের কেন্দ্রে তুরস্কের সামরিক ভূমিকা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে সিরিয়ার নতুন নেতৃত্ব তুরস্কের ঘনিষ্ঠ মিত্র হওয়ায় দামেস্কে আঙ্কারার প্রভাব নিয়ে ইসরায়েলের উদ্বেগ বাড়ছে।
নেতানিয়াহু বুধবার (১৮ আগস্ট) বলেন, সিরিয়ায় এমন কোনো তুর্কি সামরিক উপস্থিতি ইসরায়েল মেনে নেবে না, যা দক্ষিণ দিকে বিস্তৃত হয়ে ইসরায়েলের জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে। তুরস্ককে সতর্ক করে তিনি সরাসরি বলেন, এমন কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে হবে।
এর এক দিন পর ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজও তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানকে সিরিয়ায় বিপজ্জনক অভিযানের দিকে দেশকে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ করেন। ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য কোনো পক্ষকে হুমকি হয়ে উঠতে দেওয়া হবে না বলেও সতর্ক করেন তিনি।
ঘটনার আগে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের প্রধান রোমান গোফম্যান ও সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে ফোনালাপ হয়েছিল বলেও জানিয়েছে রয়টার্স। সূত্রগুলোর দাবি, ১৪ আগস্টের ওই আলোচনায় সিরিয়ায় তুরস্কের সামরিক উপস্থিতি নিয়ে কথা হয়েছিল। সিরিয়ার নতুন সরকারের সঙ্গে ইসরায়েলের উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের মধ্যে এটিকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইসরায়েলি হামলায় আবু দাহুর ঘাঁটিতে অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হলেও কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি বলে জানিয়েছে দামেস্ক। যুক্তরাষ্ট্রের সিরিয়াবিষয়ক দূত টম ব্যারাকও হামলাটিকে অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা বৃদ্ধি হিসেবে সমালোচনা করেছেন। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কোনো সমালোচনা করেননি; তিনি শুধু বলেছেন, ওয়াশিংটন হামলার বিষয়ে অবহিত ছিল।
বাশার আল-আসাদের পতনের পর সিরিয়ায় ইসরায়েল ইতোমধ্যে শত শত হামলা চালিয়েছে। তবে সর্বশেষ আবু দাহুরে হামলাটি দক্ষিণ সিরিয়ার ইসরায়েলি নিরাপত্তা অঞ্চলের তুলনায় অনেক গভীরে হওয়ায় ঘটনাটি নতুন করে আঞ্চলিক উত্তেজনা তৈরি করেছে।
এদিকে সিরিয়া ও ইসরায়েলের মধ্যে সরাসরি আলোচনা এবং গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের ব্যবস্থা তৈরির উদ্যোগ চললেও তুরস্কের সম্ভাব্য সামরিক উপস্থিতি সেই সম্পর্কের নতুন একটি বড় বিরোধের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সূত্র: টাইমস অব ইসরায়েল