গাজায় ফুরিয়ে আসছে কবর দেওয়ার জায়গাও

গাজায় যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে একের পর এক মরদেহ উদ্ধার হচ্ছে। স্বজনেরা প্রিয়জনের দেহ ফিরে পেলেও নতুন সংকট দেখা দিয়েছে—তাদের দাফনের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা আর নেই। যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়ী ধ্বংসযজ্ঞে অনেক কবরস্থান ভরে গেছে, আবার বহু সমাধিস্থলও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজার জেইতুন এলাকার ২০ বছর বয়সী ওমর আল-সাওহিকে সম্প্রতি তাঁর বাবা মোহাম্মদ আল-সাওহির মরদেহ দাফনের জায়গা খুঁজতে হয়েছে। মোহাম্মদ গত ১০ জুন গাজার একটি এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। স্বজনেরা তাঁকে দাফনের জন্য জেইতুন কবরস্থানে গেলে সেখানে নতুন কবরের জন্য জায়গা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

কবরস্থানটির অনেক কবর এতটাই পাশাপাশি যে কোথাও কোথাও শুধু একটি পাথর ও কাগজে মৃত ব্যক্তির নাম লিখে রাখা হয়েছে। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে যথাযথভাবে কবর প্রস্তুত করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। জায়গার সংকট ও কবরের ব্যয়ের কারণে ওমরের পরিবার শেষ পর্যন্ত তাঁর বাবাকে দাদার কবরে দাফন করতে বাধ্য হয়।

যুদ্ধের কারণে বদলে গেছে দাফনের চিত্র

গাজায় দীর্ঘদিন ধরে চলা সংঘাতের কারণে মৃতদের স্বাভাবিকভাবে দাফন করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। হামলা, ধ্বংসস্তূপ ও নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে অনেক মরদেহ দীর্ঘ সময় উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে নিহতদের বাড়ির আঙিনা, তাঁবু, বাস্তুচ্যুতদের ক্যাম্প, স্কুল কিংবা হাসপাতালের চত্বরে অস্থায়ীভাবে দাফন করতে হয়েছে।

যুদ্ধের কারণে কবরস্থানগুলোর ওপরও চাপ বেড়েছে। বিপুলসংখ্যক নিহতের পাশাপাশি অনেক পুরোনো কবরস্থান ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হওয়ায় নতুন কবরের জায়গা আরও সংকুচিত হয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে বহু মরদেহ উদ্ধারের পর গাজায় একের পর এক জানাজা ও গণদাফন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ৪ আগস্ট গাজা সিটিতে দুই পরিবারের ১১২ জন সদস্যের মরদেহ একসঙ্গে দাফন করা হয়। এসব মরদেহ ২০২৩ সালের একটি বিমান হামলার পর আড়াই বছরের বেশি সময় ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে ছিল।

এরপর ২০ আগস্ট গাজা সিটির আল-শিফা মেডিকেল কমপ্লেক্সের চত্বরে আরও ৫০ জনের মরদেহ দাফন করা হয়। তাদেরও দীর্ঘ সময় ধ্বংসস্তূপের নিচে পড়ে থাকার পর উদ্ধার করা হয়েছিল।

শেষ বিদায়টুকুও কঠিন

মৃত স্বজনকে যথাযথভাবে দাফন করা পরিবারের জন্য ধর্মীয়, সামাজিক ও মানসিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু গাজায় যুদ্ধ সেই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াটিকেও কঠিন করে তুলেছে। অনেক পরিবারকে প্রথমে অস্থায়ী স্থানে দাফন করতে হয়েছে, পরে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে মরদেহ তুলে স্থায়ী কবরস্থানে নেওয়ার চেষ্টা করতে হচ্ছে।

মরদেহ স্থানান্তরের ক্ষেত্রেও স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়ের প্রয়োজন হয়। ফলে একটি পরিবার স্বজনের মরদেহ ফিরে পেলেও শেষকৃত্য সম্পন্ন করার জন্য তাকে আরও নানা বাধার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

গাজায় যুদ্ধের ক্ষত তাই শুধু জীবিতদের জীবনেই সীমাবদ্ধ নেই। ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়িঘর, হাসপাতাল ও অবকাঠামোর পাশাপাশি কবরস্থানগুলোও এই বিপর্যয়ের সাক্ষী হয়ে উঠেছে। মরদেহ উদ্ধার ও স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এখন মৃতদের জন্য নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ শেষ ঠিকানা নিশ্চিত করাও বড় মানবিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।