গাজা যুদ্ধের বেদনা ও স্মৃতিতে খালেদ হুরানির ‘১০৩০+’

ফিলিস্তিনের গাজায় চলমান যুদ্ধ, ধ্বংসযজ্ঞ, শোক ও হারিয়ে যাওয়া শৈশবের বেদনাকে ভিন্ন এক শিল্পভাষায় তুলে ধরেছেন ফিলিস্তিনি শিল্পী খালেদ হুরানি। তাঁর ‘১০৩০+’ শীর্ষক শিল্পপ্রদর্শনী অনলাইনে আয়োজন করেছে জাওয়েহ গ্যালারি। প্রদর্শনীটি আগামী ১ অক্টোবর পর্যন্ত অনলাইনে দেখা যাবে।

প্রদর্শনীর শিরোনাম ‘১০৩০+’ রাখা হয়েছে গাজায় ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধ শুরুর পর প্রদর্শনী উদ্বোধনের সময় পর্যন্ত অতিক্রান্ত দিনের সংখ্যা থেকে। তবে হুরানি তাঁর শিল্পকর্মকে যুদ্ধের সরাসরি চিত্রায়ণ হিসেবে দেখছেন না। তাঁর মতে, যুদ্ধের ঘটনা একসময় হয়তো ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়, কিন্তু মানুষের মনে এর ক্ষত, স্মৃতি ও মানসিক অভিঘাত সহজে মুছে যায় না। তাঁর শিল্পের বিষয় মূলত সেই যুদ্ধ-পরবর্তী মানবিক অস্তিত্ব।

শিল্পীর ভাষায়, তাঁর কাজগুলো যুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহ নয়; বরং ঘটনাগুলো স্তিমিত হয়ে যাওয়ার পর মানুষের অস্তিত্বের কী অবস্থা হয়, তা নিয়ে। তাঁর চিত্রে মানুষ যেন পৃথিবী ও আকাশের মাঝামাঝি এক অনিশ্চিত অবস্থানে স্থির হয়ে থাকে। সেখানে মানুষের শরীর হয়ে ওঠে ঘটে যাওয়া বিপর্যয়ের সাক্ষী, আর একই বাতাসে শ্বাস নেওয়া হয়ে দাঁড়ায় মানুষের মধ্যে টিকে থাকা শেষ সংযোগ।

‘ওহ মাই গাজা’

প্রদর্শনীর উল্লেখযোগ্য শিল্পকর্মগুলোর একটি ‘ওহ মাই গাজা’। ফিলিস্তিনি লেখক জিয়াদ খাদ্দাশ তাঁর একটি কবিতায় কল্পনা করেছিলেন, যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত শিশুদের সাময়িকভাবে আকাশে তুলে রাখা হবে। শিল্পী খালেদ হুরানির কিছু চিত্রকর্মে সেই কল্পনাই যেন দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।

প্রদর্শনীর ভূমিকায় রানা আনানি লিখেছেন, হুরানির চিত্রে মেঘ শিশুদের জন্য এক ধরনের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে। বোমাবর্ষণ, ধ্বংস আর মৃত্যুর ভয়াবহতা থেকে দূরে সেই মেঘের জগতে শিশুরা যেন আশ্রয় খুঁজে নেয়। পৃথিবী যে শৈশব তাদের কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে, কল্পনার সেই আকাশে তারা যেন আবার সেই হারানো শৈশব ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করে।

‘শ্রাউডেড ইন ব্লু’

প্রদর্শনীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ ‘শ্রাউডেড ইন ব্লু’। এতে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া একটি শহরের ওপরে আকাশে ভাসমান নীল কাফনে মোড়ানো একটি মৃত শিশুকে দেখা যায়। চিত্রটি একই সঙ্গে যুদ্ধের নির্মমতা, শিশুমৃত্যু এবং মানুষের অসহায়ত্বের প্রতীক হয়ে উঠেছে।

রানা আনানির মতে, হুরানির এ ধরনের চিত্রকর্ম কেবল দৃশ্যমান বাস্তবতার প্রতিফলন নয়; এগুলো দর্শককে গভীর আধ্যাত্মিক ভাবনার জগতে নিয়ে যায়। তাঁর ক্যানভাসে মেঘ পৃথিবী ও আকাশের মাঝখানে একটি স্বচ্ছ পর্দার মতো কাজ করে। কখনো তা জীবন ও মৃত্যুর মধ্যবর্তী এক সীমারেখা, আবার কখনো পরিচিত বাস্তবতার সমান্তরালে থাকা এক অদৃশ্য জগতের প্রতীক।

হুরানির চিত্রের মেঘের ভেতর দিয়ে মানুষের অন্তর্জগতের বেদনা, শোক ও কল্পনার শক্তি ফুটে ওঠে। যুদ্ধের নির্মম বাস্তবতায় যখন মানুষের চারপাশের সব আশ্রয় ধ্বংস হয়ে যায়, তখন কল্পনাই হয়ে ওঠে শেষ আশ্রয়। সেই কল্পনার জগতে মানুষ অন্তত কিছু সময়ের জন্য যুদ্ধ, ধ্বংস, মৃত্যু ও বাস্তুচ্যুতির যন্ত্রণা থেকে দূরে থাকার সুযোগ পায়।

‘১০৩০+’ তাই শুধু একটি শিল্পপ্রদর্শনী নয়; বরং গাজা যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়ী মানবিক অভিঘাত, হারিয়ে যাওয়া শৈশব এবং বেদনার মধ্যেও আশ্রয় খোঁজার এক শিল্পিত দলিল। খালেদ হুরানির ক্যানভাসে যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের পাশাপাশি উঠে এসেছে মানুষের স্মৃতি, কল্পনা ও টিকে থাকার আকাঙ্ক্ষা।

সূত্র: আরব নিউজ