মদিনাকে কেন ‘তাইয়িবা’ বলা হয়

মরুর বুকে এক পবিত্র নগরী—মদিনা। এই শহরের নাম উচ্চারণ করলেই মুসলমানের হৃদয়ে জেগে ওঠে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও গভীর আবেগ। এখানেই মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) হিজরত করে ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। এখানেই রয়েছে মসজিদে নববি, যেখানে শায়িত আছেন বিশ্বনবী (সা.)। তাই মদিনা শুধু একটি শহরের নাম নয়; এটি মুসলমানের কাছে ভালোবাসা, শান্তি, পবিত্রতা ও আত্মিক প্রশান্তির এক অনন্য প্রতীক।

মদিনার বহু নামের মধ্যে ‘তাইয়িবা’ বা ‘তাইবা’ অন্যতম। আরবি ‘তাইয়িব’ শব্দের অর্থ ভালো, পবিত্র, সুন্দর, উৎকৃষ্ট, মনোরম ও সুগন্ধময়। সেই অর্থে ‘তাইয়িবা’ নামের মধ্যেই যেন এই নগরীর আধ্যাত্মিক সৌন্দর্য ও পবিত্রতার পরিচয় নিহিত রয়েছে।

তবে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা প্রয়োজন—মদিনার ‘তাইবা’ বা ‘তাবা’ নামটি কেবল পরবর্তী যুগের কোনো অলংকারময় নাম নয়; হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেই মদিনাকে এই নামে অভিহিত করেছেন।

‘ইয়াসরিব’ থেকে মদিনা

ইসলামের আবির্ভাবের আগে মদিনা ‘ইয়াসরিব’ নামে পরিচিত ছিল। মহানবী (সা.)-এর হিজরতের পর শহরটি ইসলামের ইতিহাসে নতুন মর্যাদা লাভ করে এবং ‘মদিনাতুন নবী’—অর্থাৎ নবীর নগরী—নামে পরিচিতি পায়।

হাদিসে ‘ইয়াসরিব’ নামের উল্লেখও পাওয়া যায়। সহিহ মুসলিমের একটি বর্ণনায় রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তাঁকে এমন একটি জনপদে হিজরতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাকে লোকেরা ‘ইয়াসরিব’ বলে; আর সেটিই মদিনা। একই বর্ণনায় মদিনাকে এমন এক নগরী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যা অপবিত্রতা দূর করে, যেমন আগুন লোহার ময়লা দূর করে।

এখানেই মদিনার নামের তাৎপর্য আরও গভীর হয়ে ওঠে। এটি শুধু নামের পরিবর্তন নয়; ইসলামের আগমনের পর নগরীটির সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও নৈতিক পরিচিতিতেও ঘটে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন।

‘তাইবা’ নামটি এল কোথা থেকে?

সহিহ মুসলিমের একটি হাদিসে জাবির ইবনে সামুরা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—“আল্লাহ মদিনার নাম ‘তাবা’ রেখেছেন।” অর্থাৎ এই নামের সঙ্গে সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত নামের বিষয়টি হাদিসে উল্লেখ হয়েছে।

অন্য একটি সহিহ হাদিসে যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) বর্ণনা করেন, নবীজি (সা.) বলেছেন, “এটি তাইবা”—অর্থাৎ মদিনা। একই বর্ণনায় মদিনার এমন একটি বৈশিষ্ট্যের কথাও এসেছে যে, এটি অপবিত্রতা দূর করে, যেমন আগুন রূপার ময়লা দূর করে।

সহিহ বুখারিতেও মদিনার ‘তাবা’ নামের উল্লেখ রয়েছে। তাবুক অভিযান থেকে ফেরার পথে মদিনা দৃষ্টিগোচর হলে মহানবী (সা.) বলেন, “এটি তাবা।”

অর্থাৎ ‘তাইবা’, ‘তাইয়িবা’ ও ‘তাবা’—উচ্চারণের ভিন্নতার মধ্যেও একই পবিত্র নগরীর নামের বিভিন্ন রূপ পাওয়া যায়।

কেন ‘তাইয়িবা’—তার মধ্যেই আছে পবিত্রতার বার্তা

আরবি ভাষায় ‘তাইয়িব’ শব্দের সঙ্গে ভালো, পবিত্র, নির্মল, উৎকৃষ্ট ও মনোরম অর্থের সম্পর্ক রয়েছে। এ কারণে ‘তাইবা’ বা ‘তাইয়িবা’ নামটি মদিনার আধ্যাত্মিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে অত্যন্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ।

মদিনা এমন এক নগরী, যেখানে ইসলামের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল। মক্কার নির্যাতন ও প্রতিকূলতার পর মুসলমানদের জন্য মদিনা হয়ে উঠেছিল নিরাপদ আশ্রয়। আনসাররা মুহাজিরদের স্বাগত জানিয়েছিলেন। এখানেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ভ্রাতৃত্ব, সহযোগিতা ও ন্যায়ভিত্তিক একটি সমাজের অনন্য দৃষ্টান্ত।

তাই ‘তাইয়িবা’ নামের মধ্যে শুধু ভৌগোলিক পরিচয় নেই; আছে একটি আদর্শ সমাজের স্মৃতি, নবীপ্রেমের আবেগ এবং ইসলামের ইতিহাসের গভীরতম অধ্যায়ের প্রতিধ্বনি।

হিজরতের পর বদলে যায় মদিনার পরিচয়

৬২২ খ্রিষ্টাব্দে মহানবী (সা.) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেন। ইসলামের ইতিহাসে এই হিজরত একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এর মধ্য দিয়েই শুরু হয় হিজরি সনের গণনা এবং মুসলিম উম্মাহর ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা।

মদিনায় পৌঁছে মহানবী (সা.) শুধু একটি শহরে বসতি স্থাপন করেননি; তিনি একটি সমাজের ভিত্তি নির্মাণ করেছিলেন। মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা, মদিনা সনদের মাধ্যমে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সহাবস্থান এবং মসজিদে নববিকে কেন্দ্র করে সামাজিক-ধর্মীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনা—সবকিছু মিলিয়ে মদিনা হয়ে ওঠে ইসলামী সভ্যতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

এই কারণেই মদিনা পরবর্তী সময়ে ‘মদিনাতুন নবী’, ‘আল-মদিনা আল-মুনাওয়ারা’, ‘তাইবা’, ‘তাবা’সহ নানা সম্মানসূচক নামে পরিচিত হয়েছে।

মদিনা কেন ‘পবিত্র নগরী’

মদিনার মর্যাদা শুধু সেখানে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অবস্থানের কারণে নয়; ইসলামী শরিয়তেও এই নগরীর বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। সহিহ মুসলিমের একটি হাদিসে নবীজি (সা.) মদিনাকে নিরাপদ পবিত্র এলাকা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

আরেকাধিক হাদিসে মদিনার এমন বৈশিষ্ট্যের কথা বলা হয়েছে যে, এটি অপবিত্রতা ও অনিষ্ট থেকে নিজেকে পৃথক করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনাকে এমন এক ভাটির সঙ্গে তুলনা করেছেন, যা ধাতুর ময়লা দূর করে বিশুদ্ধ অংশকে আলাদা করে।

এই উপমা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এখানে মদিনার পবিত্রতা শুধু বাহ্যিক পরিচ্ছন্নতার অর্থে নয়; বরং ঈমান, নৈতিকতা ও আত্মিক পরিশুদ্ধতার প্রতীক হিসেবেও উপস্থাপিত হয়েছে।

নামের মধ্যেই নবীপ্রেম

মদিনার নামের সঙ্গে মুসলমানের আবেগের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমান যখন মদিনার দিকে ফিরে দরুদ ও সালাম পাঠান, তখন তাদের কল্পনায় ভেসে ওঠে সবুজ গম্বুজ, মসজিদে নববির মিনার, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর রওজা মোবারক এবং সেই ঐতিহাসিক নগরীর পথঘাট।

‘তাইয়িবা’ নামটি তাই শুধু অভিধানের কোনো শব্দ নয়। এটি মুসলমানের কাছে এক ধরনের অনুভূতি। ‘তাইয়িবা’ বললে মনে হয়—পবিত্রতা, সৌন্দর্য, প্রশান্তি ও নবীপ্রেম যেন একই শব্দে মিলেমিশে গেছে।

‘ইয়াসরিব’ নামটি কি একেবারেই ব্যবহার করা যাবে না?

এখানেও একটি সূক্ষ্ম বিষয় রয়েছে। হাদিসে ‘ইয়াসরিব’ নামটি এসেছে—অর্থাৎ ঐতিহাসিকভাবে এটি শহরটির প্রচলিত নাম ছিল। তবে রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনাকে ‘তাইবা’ ও ‘তাবা’ নামে অভিহিত করেছেন এবং হাদিসে ‘মদিনা’ নামটিকেও প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

ইসলামী ঐতিহ্যে তাই মদিনাকে সম্মানসূচক ও সুন্দর নামেই সম্বোধন করার প্রবণতা দেখা যায়। কারণ নবীজি (সা.)-এর সঙ্গে সম্পর্কিত এই নগরীর প্রতি মুসলমানের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা নামের মধ্যেও প্রকাশ পায়।

‘তাইয়িবা’—একটি নাম, একটি ইতিহাস

মদিনার ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ‘তাইয়িবা’ নামটি যেন নগরীর পুরো ইতিহাসের সঙ্গে মিশে আছে। মক্কার নির্যাতিত মুসলমানদের আশ্রয়, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হিজরত, আনসারদের অভ্যর্থনা, মসজিদে নববির নির্মাণ, ইসলামী সমাজের বিকাশ—সবকিছুর সাক্ষী এই নগরী।

এখানেই নবীজি (সা.) তাঁর জীবনের শেষ সময় কাটিয়েছেন। এখানেই তাঁর ইন্তেকাল এবং এখানেই তাঁর পবিত্র রওজা। ফলে মদিনার প্রতিটি প্রান্ত মুসলমানের কাছে ইতিহাস ও ভালোবাসার এক অমূল্য স্মারক।

আর সেই কারণেই ‘তাইয়িবা’ নামটি উচ্চারণ করলে শুধু একটি শহরের কথা মনে পড়ে না; মনে পড়ে এমন একটি ভূমির কথা, যাকে মহানবী (সা.) নিজেই পবিত্র ও সুন্দর নাম দিয়েছেন।

মদিনা তাই শুধু একটি নগরী নয়—এটি নবীপ্রেমের নগরী, হিজরতের স্মৃতিবিজড়িত নগরী, ইসলামী সভ্যতার এক ঐতিহাসিক কেন্দ্র। আর ‘তাইয়িবা’—তারই এক মধুর, পবিত্র ও হৃদয়স্পর্শী পরিচয়