ইয়েমেনে হুথি বিদ্রোহী ও সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর মধ্যে নতুন করে সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করেছে। একই সময়ে সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহরগুলোতে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা অব্যাহত থাকায় একাধিকবার জরুরি সতর্কতা জারি করা হয়েছে। এতে দীর্ঘদিনের স্থবির ইয়েমেন যুদ্ধ আবার বড় আকারে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে হুথিরা সৌদি আরবের খামিস মুশাইত, আবহা ও জাজানসহ দক্ষিণাঞ্চলীয় এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে জানিয়েছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। ৯ সেপ্টেম্বরের হামলায় এসব শহরকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুরকি আল-মালিকি জানান, হামলাগুলোতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে।
এর আগে হুথিদের বড় ধরনের হামলায় সৌদি আরবের চারটি দক্ষিণাঞ্চলীয় শহরে অন্তত ৭৩ জন আহত হন বলে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে। হামলায় জ্বালানি অবকাঠামোসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আগুন লাগার ঘটনাও ঘটে। এতে সৌদি আরবের জ্বালানি সরবরাহ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার খামিস মুশাইত এলাকায় আবারও জরুরি সতর্কতা জারি করা হয়। পরে সৌদি বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ জানায়, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে এবং সতর্কতা তুলে নেওয়া হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ওই এলাকায় একাধিকবার সতর্কতা জারি করা হয়েছিল।
অন্যদিকে ইয়েমেনের ভেতরেও সংঘর্ষ ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। হুথি নিয়ন্ত্রিত আল-মাসিরাহ টেলিভিশনের দাবি, সৌদি-সমর্থিত বাহিনী তায়েজ, আল-জাওফ, হোদেইদা ও মারিবসহ বিভিন্ন প্রদেশে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে। তবে এসব হামলার সংখ্যা ও বিস্তারিত তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
হুথিদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, ৯ সেপ্টেম্বরের আগের ১২ ঘণ্টায় সৌদি বিমানবাহিনী ইয়েমেনের বিভিন্ন এলাকায় ৫০টির বেশি হামলা চালিয়েছে। তায়েজ ও হোদেইদা বিশেষভাবে সংঘাতের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
এই সংঘাতের বড় কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে বাব আল-মান্দাব প্রণালিকে ঘিরে। লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত এই সরু জলপথ এশিয়া, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে পণ্য ও জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে পারলে হুথিরা এই গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুটে আরও বেশি প্রভাব বিস্তার করতে পারে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুথিরা পশ্চিম উপকূলের মোকা ও ধুবাবের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোর দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এসব এলাকা বাব আল-মান্দাবের কাছাকাছি হওয়ায় সংঘাতের সামরিক গুরুত্বও বেড়ে গেছে। ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি হলেও তা দীর্ঘদিন ধরেই ভঙ্গুর অবস্থায় ছিল। সাম্প্রতিক লড়াই সেই যুদ্ধবিরতিকে আরও ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
সংঘাতের প্রভাব শুধু ইয়েমেন ও সৌদি আরবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কা নেই। লোহিত সাগরে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল এবং মধ্যপ্রাচ্যের তেল পরিবহনেও এর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা ও জাহাজ চলাচলে বিঘ্নের পাশাপাশি বাব আল-মান্দাবেও অস্থিরতা বাড়লে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।
এদিকে সংঘাত নতুন করে মানবিক সংকটও তৈরি করছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক লড়াইয়ে প্রায় ২০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। দীর্ঘদিনের যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট ও মানবিক দুর্ভোগের মধ্যে থাকা ইয়েমেনের সাধারণ মানুষের ওপর এতে নতুন করে চাপ বাড়ছে।
সব মিলিয়ে ইয়েমেনে নতুন করে তীব্র হওয়া লড়াই এখন আর শুধু অভ্যন্তরীণ সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সৌদি ভূখণ্ডে হুথিদের হামলা, পাল্টা বিমান হামলা এবং বাব আল-মান্দাবের আশপাশে সামরিক তৎপরতা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট আরও বিস্তৃত করার ঝুঁকি তৈরি করেছে। পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে এর প্রভাব পড়তে পারে লোহিত সাগরের নৌপথ, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও।