লোহিত সাগরের নৌপথ নিয়ন্ত্রণে হুথিদের ব্যবহার করছে ইরান: ইয়েমেনি রাষ্ট্রদূত

আপডেট : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৫২ পিএম

ইয়েমেনে নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাতের পেছনে ইরানের ভূমিকা রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন কাতারে নিযুক্ত ইয়েমেনের রাষ্ট্রদূত রাজেহ বাদি। তাঁর দাবি, লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোর ওপর প্রভাব বাড়াতে ইরান হুথি বিদ্রোহীদের ব্যবহার করছে।

আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রাজেহ বাদি বলেন, সাম্প্রতিক লড়াইয়ের সূচনা করেছে হুথিরাই। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, লোহিত সাগরের উপকূলবর্তী কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো দখলের লক্ষ্য নিয়ে হুথিরা আকস্মিক অভিযান শুরু করেছে। এর মাধ্যমে ইরানের উদ্দেশ্য হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক যোগাযোগপথের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি করা।

ইরান ও হুথিদের সম্পর্ক এখন আর গোপন কোনো বিষয় নয় বলেও মন্তব্য করেন ইয়েমেনি রাষ্ট্রদূত। তাঁর মতে, লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইরাকের পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেসের (পিএমএফ) পাশাপাশি হুথিরাও মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক মিত্র ও প্রভাববলয়ের অংশ।

রাজেহ বাদির দাবি, ইরানের অন্যান্য আঞ্চলিক মিত্ররা যখন নানা ধরনের চাপের মুখে রয়েছে, তখন তেহরান হুথিদের ওপর আরও বেশি নির্ভর করছে। তাঁর ভাষায়, হুথিরাই এখন ইরানের হাতে থাকা গুরুত্বপূর্ণ অবশিষ্ট প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার। প্রায় পাঁচ বছর ধরে তুলনামূলক স্থবির থাকার পর ইয়েমেনে আবার যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি করতেও ইরান ভূমিকা রেখেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

ইয়েমেনের সাবেক প্রেসিডেন্ট আবদ-রাব্বু মনসুর হাদির একটি মন্তব্যও স্মরণ করেন রাজেহ বাদি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, হাদি একসময় সতর্ক করে বলেছিলেন, ইরান যদি বাব আল-মান্দাব ও হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে, তাহলে দেশটির আর পারমাণবিক অস্ত্রের প্রয়োজন হবে না।

রাষ্ট্রদূত বলেন, এই দুই গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক ‘চোক পয়েন্ট’-এর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারলে ইরানের ক্ষমতা যেকোনো পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডারের চেয়েও বেশি কার্যকর হয়ে উঠতে পারে। তাঁর দাবি, সাম্প্রতিক ঘটনাবলি হাদির সেই আশঙ্কাকে সত্য প্রমাণ করেছে।

কেন গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দাব?

বাব আল-মান্দাব হলো লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের মধ্যবর্তী একটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ। এ পথ দিয়েই এশিয়া, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে বিপুল পরিমাণ পণ্য ও জ্বালানি পরিবহন হয়। ফলে এই নৌপথে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।

অন্যদিকে হরমুজ প্রণালি পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল ও গ্যাস রপ্তানির অন্যতম প্রধান পথ। ফলে একই সঙ্গে বাব আল-মান্দাব ও হরমুজ প্রণালিতে কোনো পক্ষের প্রভাব বা নিয়ন্ত্রণ বাড়লে বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তায় তার বড় প্রভাব পড়তে পারে।

ইয়েমেনি রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত একাধিক ফ্রন্টে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ লড়াইয়ের সঙ্গে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর স্বার্থ জড়িয়ে পড়ায় দেশটির সংঘাত এখন শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই।

তবে ইরান ইয়েমেনে চলমান সংঘাতের পেছনে সরাসরি ভূমিকা রাখছে—রাষ্ট্রদূতের এই অভিযোগের বিষয়ে ইরানের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া উল্লেখ করা হয়নি।

রাজেহ বাদির বক্তব্যের মূল সতর্কবার্তা হলো, ইয়েমেনের সংঘাত কেবল দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের লড়াই নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দুটি সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ—বাব আল-মান্দাব ও হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা। এসব নৌপথে অস্থিতিশীলতা যত বাড়বে, তার প্রভাব তত বেশি ছড়িয়ে পড়তে পারে আঞ্চলিক রাজনীতি থেকে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে।

ওয়াইএ
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত