ইসরায়েলি সেনাদের মানহানি করে এমন যেকোনো ব্যক্তির নাগরিকত্ব বাতিলের জন্য আইন প্রণয়নের হুমকি দিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। গাজায় বেসামরিক মানুষ হত্যার অভিযোগ নিয়ে নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র নাজা–এর ইসরায়েলি নির্মাতাদের বিরুদ্ধে সর্বশেষ হুঁশিয়ারি হিসেবে বুধবার (১৭ সেপ্টেম্বর) এ ঘোষণা দেন তিনি।
ইসরায়েলি সাংবাদিক ইউভাল আব্রাহাম ও র্যাচেল সোর নির্মিত নাজা প্রামাণ্যচিত্রে গাজায় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর হামলায় বেসামরিক মানুষের ব্যাপক প্রাণহানির বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। চলচ্চিত্রটিতে অভিযোগ করা হয়েছে, গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর লক্ষ্য নির্ধারণের সিদ্ধান্তের মধ্যেই নিয়মিতভাবে বিপুলসংখ্যক বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে নেতানিয়াহু ও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
গত শনিবার ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে বড় একটি পুরস্কার পাওয়ার পর নাজা নিয়ে ইসরায়েলে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। চলচ্চিত্রটির নামটি ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীতে ব্যবহৃত একটি শব্দ থেকে নেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে প্রত্যাশিত বেসামরিক প্রাণহানিকে বোঝানো হয়। চলচ্চিত্রটিতে গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও সেনাদের বেনামে দেওয়া সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে গাজায় সামরিক অভিযানের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে।
চলচ্চিত্রটি নিয়ে ইসরায়েলে সমালোচনা ও পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি খতিয়ে দেখছে দেশটির সামরিক বাহিনী। একই সময়ে ২৭ অক্টোবরের নির্বাচন সামনে রেখে ইসরায়েলের রাজনৈতিক অঙ্গনেও নাজা নিয়ে বিতর্ক ছড়িয়ে পড়েছে। জনমত জরিপগুলোতে নেতানিয়াহুর ডানপন্থি জোট নির্বাচনে পরাজিত হতে পারে বলে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
মঙ্গলবার নেতানিয়াহু তার কয়েকজন নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে নাজা–এর বিষয়ে কঠোর অবস্থান না নেওয়ার অভিযোগ তোলেন। তাদের এমন অবস্থানকে তিনি সরকারি দায়িত্ব পালনের জন্য অযোগ্যতার কারণ হিসেবে তুলে ধরেন। এর পরদিন বুধবার ইসরায়েলি সেনাদের বিরুদ্ধে মানহানিকর বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড ঠেকাতে দুটি আইনি উদ্যোগ নেওয়ার ঘোষণা দেন তিনি।
নেতানিয়াহু বলেন, প্রথম প্রস্তাবের মাধ্যমে ইসরায়েলি সেনাদের মানহানি করে এমন ব্যক্তির নাগরিকত্ব বাতিল করা হবে। দ্বিতীয় প্রস্তাবে মানহানির জন্য আইনি ক্ষতিপূরণের পরিমাণ ২০ গুণ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। তার ভাষ্য, যারা ইসরায়েলি সেনাদের বিরুদ্ধে এ ধরনের কর্মকাণ্ড চালাবে, তাদের অর্থনৈতিকভাবে এবং নাগরিকত্বের দিক থেকেও শাস্তির মুখে পড়তে হবে।
নতুন আইন প্রণয়নের পক্ষে যুক্তি দিতে নেতানিয়াহু তিনটি ঘটনার উল্লেখ করেন। এর মধ্যে রয়েছে সাম্প্রতিক নাজা প্রামাণ্যচিত্র, সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও বামপন্থি রাজনীতিক ইয়াইর গোলানের ২০২৫ সালের মন্তব্য এবং ২০২৪ সালে গাজায় এক আটক ব্যক্তির ওপর সেনাদের নির্যাতনের ভিডিও ফাঁসের ঘটনা।
ইসরায়েলের সুপ্রিম কোর্ট ২০২২ সালে এমন একটি আইন বহাল রেখেছিল, যার আওতায় রাষ্ট্রের প্রতি আস্থাভঙ্গ হিসেবে বিবেচিত কর্মকাণ্ডে জড়িত ইসরায়েলিদের নাগরিকত্ব বাতিলের সুযোগ রয়েছে। তবে নেতানিয়াহুর প্রস্তাবিত নতুন আইনও আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নাজা–এর নির্মাতারা জানিয়েছেন, ইসরায়েলিদের এই প্রামাণ্যচিত্র দেখা এবং এতে উপস্থাপিত বক্তব্য নিয়ে ভাবা গুরুত্বপূর্ণ। এদিকে গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের হিসাবে, ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে এ পর্যন্ত ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের বেশির ভাগই বেসামরিক নাগরিক। দীর্ঘস্থায়ী এই অভিযানে গাজার বিস্তীর্ণ এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। সূত্র: ডন