ধ্বংসস্তূপ আর হামলার আতঙ্কের মধ্যেই গাজায় ফিরলো শিক্ষার্থীরা

ইসরায়েলি হামলার আতঙ্ক আর ধ্বংসস্তূপের বাস্তবতার মধ্যেই শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) গাজার বিভিন্ন এলাকায় আবারও স্কুলমুখী হয়েছে শিক্ষার্থীরা। দীর্ঘদিনের যুদ্ধ ও বাস্তুচ্যুতির পর শ্রেণিকক্ষে ফেরার আনন্দ থাকলেও কাছাকাছি বিস্ফোরণের শব্দ মুহূর্তেই সেই আনন্দকে আতঙ্কে পরিণত করছে।

গাজা গ্রেট মাইন্ডস ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা আহমেদ আবু রিজিক আল জাজিরাকে বলেন, স্কুলে ফেরার প্রথম দিনে অনেক শিশুর মুখে আনন্দের ছাপ দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু কাছাকাছি একটি হামলার শব্দ শোনার পর সেই দৃশ্য বদলে যায়।

'শিক্ষার্থীদের মুখের হাসি ভয়ে পরিণত হলো'-বলেন তিনি।

গাজা সিটির একটি স্কুল থেকে কথা বলার সময় আবু রিজিক বলেন, নতুন শিক্ষাবর্ষটি আগের বছরগুলোর তুলনায় ভালো যাবে এটাই তাদের আশা। তবে অব্যাহত হামলার কারণে সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে এখনো ভয় পাচ্ছেন অনেক অভিভাবক।

গাজার শিক্ষা ব্যবস্থা যুদ্ধের কারণে ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। UNICEF-এর সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর হিসাবে, গাজায় প্রায় ৬ লাখ ৫৮ হাজার স্কুলপড়ুয়া শিশু শিক্ষার বাইরে রয়েছে। সংস্থাটি বলছে, স্কুলগুলোতে হামলা ও ব্যাপক ধ্বংসের কারণে নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম পুনরায় চালু করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

UNICEF-এর হিসাবে, গাজার প্রায় ৯৭ দশমিক ৫ শতাংশ স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। ফলে শিশুদের একটি বড় অংশকে প্রচলিত স্কুলের পরিবর্তে অস্থায়ী শিক্ষাকেন্দ্র কিংবা অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

এপ্রিলের UNICEF শিক্ষা পরিস্থিতি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, প্রায় ৭ লাখ শিশু-৪ থেকে ১৭ বছর বয়সী প্রায় তিনটি শিক্ষাবর্ষ ধরে নিয়মিত সরাসরি স্কুলশিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রায় ৪ লাখ ২০ হাজার শিশু কোনো ধরনের মুখোমুখি শিক্ষায়ও অংশ নিতে পারছে না।

শিক্ষার্থীদের জন্য শুধু শ্রেণিকক্ষে পৌঁছানোই বড় চ্যালেঞ্জ নয়; স্কুলে যাওয়ার পথও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

UNICEF জানিয়েছে, গাজায় বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ রাস্তা ও বসতিগুলোতে ছড়িয়ে রয়েছে এবং এর মধ্যে বিস্ফোরক যুদ্ধাবশেষ থাকার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে শিশুদের শিক্ষাকেন্দ্রে যাতায়াতও নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছে।

অনেক স্কুল ভবন সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিছু স্কুল আবার বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে যুদ্ধের কারণে শুধু অবকাঠামো নয়, শিশুদের নিয়মিত শিক্ষাজীবন ও নিরাপদ পরিবেশ দুটিই ভেঙে পড়েছে।
গাজার শিশুদের জন্য স্কুলে ফেরা তাই স্বাভাবিক শিক্ষাবর্ষ শুরুর মতো নয়। যুদ্ধের অভিজ্ঞতা, বাস্তুচ্যুতি, স্বজন হারানো এবং অব্যাহত হামলার আশঙ্কা তাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে আছে।

আবু রিজিক বলেন, শিক্ষকরা চান নতুন শিক্ষাবর্ষে যেন আর কোনো শিক্ষার্থীকে হারাতে না হয়।

তার কথায়, গাজার শিক্ষকদের মতো তিনিও আশা করছেন—দিনটি যেন কোনো শিশু বা শিক্ষার্থীকে হারানোর মধ্য দিয়ে শেষ না হয়।

UNICEF-ও বলছে, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ও বারবার বাস্তুচ্যুতি শিশুদের ওপর গভীর মানসিক প্রভাব ফেলেছে। সংস্থার মতে, শিক্ষা শুধু পড়াশোনায় ফেরার বিষয় নয়; শিশুদের স্বাভাবিক জীবন, মানসিক পুনরুদ্ধার ও ভবিষ্যৎ গঠনের জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ।

শিক্ষা কার্যক্রম চালু রাখতে UNICEF ও অংশীদার সংস্থাগুলো অস্থায়ী শিক্ষাকেন্দ্র, শিক্ষা উপকরণ এবং শিশুদের মানসিক সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। সেপ্টেম্বরের পরিকল্পনায় গাজা ও পশ্চিম তীর মিলিয়ে ৪ লাখ ৩৬ হাজার শিশুকে আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক শিক্ষার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে অবকাঠামো পুনর্গঠন, নিরাপদ শিক্ষাকেন্দ্র তৈরি, শিক্ষক সংকট এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি—সব মিলিয়ে গাজার শিক্ষা ব্যবস্থা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে।

এদিকে গাজায় এখনও হামলার খবর আসছে। ১৫ সেপ্টেম্বর ইসরায়েলি বিমান হামলায় অন্তত পাঁচ ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার কথা জানিয়েছিল রয়টার্স, যাদের মধ্যে দুই শিশুও ছিল বলে স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী হামলার কিছু লক্ষ্য সম্পর্কে নিজেদের বক্তব্য দিয়েছে।

ফলে গাজার শিশুদের জন্য স্কুলে ফিরে আসা যেমন নতুন আশার প্রতীক, তেমনি এটি যুদ্ধের মধ্যে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার কতটা কঠিন—তারও প্রতিচ্ছবি।

শ্রেণিকক্ষে ফিরেছে শিশুরা, কিন্তু তাদের চারপাশের বাস্তবতা এখনো যুদ্ধের।