একটি ছোট্ট বিড়ালছানা। জঙ্গলের কাছে এক ব্যক্তি সেটিকে কুড়িয়ে এনে ভেবেছিলেন, এটি বুঝি সাধারণ কোনো পোষা বিড়াল। প্রায় এক বছর পরিবারের সঙ্গে থাকার পর শুরু হলো প্রতিবেশীর মুরগি তাড়া করা। তখন বোঝা গেল এটি ঘরের বিড়াল নয়, বন্য প্রাণী।
সেই বিড়ালছানাকেই শেষ পর্যন্ত একটি প্রাণী আশ্রয়কেন্দ্রে দেওয়া হয়। সেখান থেকেই শুরু হয় প্রায় এক দশকের গবেষণা। আর সেই গবেষণার ফল—বিজ্ঞানের কাছে নতুন একটি বন্য বিড়াল প্রজাতির সন্ধান।
বোলিভিয়ার ইয়ুংগাসের মেঘে ঢাকা বনাঞ্চলে পাওয়া এই ছোট্ট বিড়ালের বৈজ্ঞানিক নাম দেওয়া হয়েছে 'লেপার্ডাস টিলকায়ো'। গবেষকদের দাবি, এক শতাব্দীরও বেশি সময় পর এটি প্রথম জীবিত নতুন বিড়াল প্রজাতি, যেটিকে বিজ্ঞানীরা আনুষ্ঠানিকভাবে শনাক্ত, নামকরণ ও বর্ণনা করেছেন। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে 'কারেন্ট বায়োলজি' সাময়িকীতে।

দেখতে যেন ছোট্ট চিতাবাঘ
লেপার্ডাস টিলকায়ো আকারে বেশ ছোট। পূর্ণবয়স্ক প্রাণীটির দেহের দৈর্ঘ্য প্রায় ৪৬ সেন্টিমিটার, ওজন প্রায় ১ দশমিক ৪ কেজি অর্থাৎ গড়পড়তা গৃহপালিত বিড়ালের চেয়েও ছোট।
হালকা বাদামি শরীরজুড়ে রয়েছে গাঢ় রঙের অনিয়মিত গোলাকার দাগ। ছোট, গোল কান, লম্বা গোঁফ এবং সরু শরীর—সব মিলিয়ে দেখতে অনেকটা ক্ষুদ্র আকারের চিতাবাঘের মতো।
প্রাথমিক পর্যায়ে অবশ্য গবেষকরাও এটিকে নতুন প্রজাতি মনে করেননি। জীববিজ্ঞানী পাওলা নোগালেস-আসকাররুনজ প্রথম প্রাণীটিকে দেখে মনে করেছিলেন, এটি 'লেপার্ডাস টাইগ্রিনাস' বা টাইগার ক্যাটেরই কোনো সদস্য। কিন্তু প্রাণীটির দেহের গঠন এবং বিশেষ করে দাগের আকার তাকে সন্দেহে ফেলে।
একটি ‘অদ্ভুত বিড়াল’ থেকেই গবেষণার শুরু
২০১৬ সালে বোলিভিয়ার একটি স্থানীয় পরিবার জঙ্গলের কাছে পাওয়া বিড়ালছানাটিকে বাড়িতে নিয়ে আসে। তারা ভেবেছিল, এটি পরিত্যক্ত কোনো গৃহপালিত বিড়াল।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে তার বন্য স্বভাব স্পষ্ট হতে থাকে। প্রায় এক বছর পর পরিবারের পক্ষে প্রাণীটিকে সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত তাকে সেনদা ভার্দে প্রাণী আশ্রয়কেন্দ্রে দেওয়া হয়।
আশ্রয়কেন্দ্রের কর্মীরা তখন বোলিভিয়ান ফেলিডস গবেষণা কর্মসূচির প্রধান বিজ্ঞানী নোগালেস-আসকাররুনজের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তারা প্রাণীটিকে বর্ণনা করেছিলেন একটি ‘অদ্ভুত বিড়াল’ হিসেবে।
প্রাণীটিকে দেখার পর গবেষকেরও মনে হয়, এটি সাধারণ কোনো বিড়াল নয়। কিন্তু ঠিক কোন প্রজাতি—সেটিই ছিল প্রশ্ন।
চোখে ধরা পড়েনি, ধরা পড়ল বংশগত বৈশিষ্ট্যে
এই আবিষ্কারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো বংশগত গবেষণা।
টাইগার ক্যাটদের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এদের বিভিন্ন প্রজাতি দেখতে এতটাই কাছাকাছি যে শুধু বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য দেখে তাদের আলাদা করা কঠিন। বিজ্ঞানীরা এ ধরনের প্রাণীকে গোপন প্রজাতিগোষ্ঠী হিসেবে বিবেচনা করেন।
তাই গবেষকরা দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগৃহীত নমুনার বংশগত তথ্য একত্র করেন। নতুন গবেষণায় মোট ৩৮টি প্রাণীর বংশগত উপাদান বিশ্লেষণ করা হয়। এর মধ্যে শত বছরের পুরোনো জাদুঘরে সংরক্ষিত নমুনাও ছিল।
এই বিশ্লেষণেই বেরিয়ে আসে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য—টাইগার ক্যাটদের যেভাবে আগে শ্রেণিবিন্যাস করা হয়েছিল, বাস্তবে তার চেয়ে বেশি বৈচিত্র্য রয়েছে। গবেষকরা মোট পাঁচটি পৃথক বংশগত প্রজাতি শনাক্ত করেন।
আর বোলিভিয়ার ইয়ুংগাসের প্রাণীটি অন্যদের থেকে আলাদা একটি স্বতন্ত্র শাখা হিসেবে উঠে আসে। বংশগত বিশ্লেষণ বলছে, এর বংশধারা অন্য টাইগার ক্যাটদের থেকে প্রায় ১৪ লাখ বছর আগে আলাদা হয়ে গিয়েছিল।
অর্থাৎ ২০২৬ সালে নতুন প্রজাতিটির সৃষ্টি হয়নি। প্রাণীটি লাখ লাখ বছর ধরেই আলাদা বিবর্তনীয় ধারায় ছিল। মানুষ ও বিজ্ঞান শুধু এতদিন সেটিকে আলাদা প্রজাতি হিসেবে শনাক্ত করতে পারেনি।
নাম ‘টিলকায়ো’ কেন?
নতুন প্রজাতির নামও এসেছে স্থানীয় মানুষের কাছ থেকে।
বোলিভিয়ার ইয়ুংগাস অঞ্চলের স্থানীয় মানুষ প্রাণীটিকে অন্য ছোট দাগযুক্ত বিড়াল থেকে আলাদা করতে ‘টিলকায়ো’ নামে ডাকতেন। সেই স্থানীয় নাম থেকেই বিজ্ঞানীরা প্রজাতিটির বৈজ্ঞানিক নাম রাখেন লেপার্ডাস টিলকায়ো।
মজার বিষয় হলো, ‘টিলকায়ো’ শব্দটির নির্দিষ্ট অর্থ স্প্যানিশ বা কেচুয়া ভাষায় পাওয়া যায়নি। স্থানীয় মানুষ গবেষকদের বলেছেন, তারা নামটি পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে শুনেছেন ‘দাদু বলতেন’, ‘মা বলতেন’-এভাবেই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে নামটি চলে এসেছে।
অর্থাৎ স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণ এবার বৈজ্ঞানিক শ্রেণিবিন্যাসেও জায়গা পেল।
কোথায় থাকে এই বিড়াল?
লেপার্ডাস টিলকায়ো পাওয়া গেছে বোলিভিয়ার ইয়ুংগাস অঞ্চলে। আন্দিজ পর্বতমালার পূর্ব ঢালে বিস্তৃত এই অঞ্চল মেঘে ঢাকা আর্দ্র বনভূমির জন্য পরিচিত।
এটি এক ধরনের পরিবর্তনশীল ভূপ্রকৃতি—একদিকে আন্দিজের উঁচু পাহাড়, অন্যদিকে আমাজন অববাহিকার নিম্নাঞ্চল। দুর্গম ও আর্দ্র এই বনাঞ্চলের বড় অংশ এখনো তুলনামূলকভাবে কম গবেষিত।
ইয়ুংগাসের বিস্তার বোলিভিয়ার বাইরে পেরু ও উত্তর আর্জেন্টিনার দিকেও রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত লেপার্ডাস টিলকায়োর বংশগত উপস্থিতি বোলিভিয়াতেই নিশ্চিত হয়েছে। এটি পুরো ইয়ুংগাস অঞ্চলে ছড়িয়ে আছে, নাকি কোনো নির্দিষ্ট বনাঞ্চলে সীমাবদ্ধ—তা এখনো জানা যায়নি।
কতগুলো টিলকায়ো আছে?
এই প্রশ্নের উত্তরই এখন সবচেয়ে বড় রহস্য।
গবেষকরা জানেন না বনে মোট কতটি লেপার্ডাস টিলকায়ো রয়েছে। এমনকি এর বিস্তৃতিও পুরোপুরি জানা নেই।
গবেষকদের আশা, হয়তো হাজার হাজার টিলকায়ো ইয়ুংগাসের বনে রয়েছে। কিন্তু এর পক্ষে এখনো নির্ভরযোগ্য জনসংখ্যা-তথ্য নেই।
প্রাণীটির খাদ্যাভ্যাস, প্রজনন, শিকারি, আয়ুষ্কাল এবং আচরণ সম্পর্কেও বিজ্ঞানীদের হাতে তথ্য খুবই সীমিত। কিছু মল নমুনায় ছোট ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর অবশিষ্টাংশ পাওয়া গেছে, যা থেকে ধারণা করা হচ্ছে ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী এর খাদ্যের অংশ হতে পারে। স্বয়ংক্রিয় ক্যামেরায় ধারণ করা তথ্যও ইঙ্গিত দিচ্ছে, প্রাণীটি রাতে বেশি সক্রিয় হতে পারে।
শত বছর পর নতুন বিড়াল কেন গুরুত্বপূর্ণ?
নতুন কোনো বিড়াল প্রজাতির আবিষ্কার খুবই বিরল ঘটনা।
এর আগে নতুন জীবিত বিড়াল প্রজাতি আনুষ্ঠানিকভাবে বর্ণনার ক্ষেত্রে ১৯২৩ সালে পাম্পাস ক্যাটের নাম উল্লেখ করা হয়। পরবর্তী সময়ে কিছু প্রাণীকে নতুন প্রজাতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে পুরোনো বৈজ্ঞানিক নাম পুনর্বহাল করে কিংবা আগে পরিচিত উপপ্রজাতিকে আলাদা প্রজাতির মর্যাদা দিয়ে।

কিন্তু লেপার্ডাস টিলকায়োর ঘটনা আলাদা। বিজ্ঞানীদের মতে, এই প্রাণীকে আগে কখনো কোনো স্বীকৃত বৈজ্ঞানিক নামে বর্ণনা করা হয়নি। ফলে এটি সরাসরি একটি আগে অজানা প্রজাতির আনুষ্ঠানিক বৈজ্ঞানিক বর্ণনা।
আবিষ্কারের পরই সংরক্ষণের প্রশ্ন
নতুন প্রজাতির সন্ধান আনন্দের হলেও এর সঙ্গে বড় উদ্বেগও এসেছে।
টাইগার ক্যাটদের আগে একটি সম্মিলিত গোষ্ঠী হিসেবে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। এখন যদি এই গোষ্ঠীকে পাঁচটি পৃথক প্রজাতিতে ভাগ করা হয়, তাহলে প্রতিটি প্রজাতির প্রকৃত জনসংখ্যা আগের ধারণার তুলনায় অনেক ছোট হতে পারে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, টাইগার ক্যাটদের বেশিরভাগ বিবর্তনীয় শাখার দীর্ঘমেয়াদি জনসংখ্যা কমেছে। কিছু ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক সর্বোচ্চ সংখ্যার তুলনায় পতন ৮০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।
ইয়ুংগাস অঞ্চলও নানা চাপের মুখে রয়েছে বন উজাড়, অগ্নিকাণ্ড, কৃষিজমি সম্প্রসারণ এবং অবৈধ খননসহ বিভিন্ন কারণে এখানকার জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে।
স্থানীয় প্রবীণদের কাছ থেকেও গবেষকরা শুনেছেন, আগের তুলনায় বনে টিলকায়ো কম দেখা যাচ্ছে।
হারিয়ে যাওয়ার আগেই কি খুঁজে পাওয়া গেল?
এই আবিষ্কারের সবচেয়ে বড় বার্তা সম্ভবত এখানেই।
মানুষের চোখে একটি ছোট, দাগযুক্ত বিড়াল হয়তো আর দশটি বন্য বিড়ালের মতোই। কিন্তু বংশগত বিশ্লেষণ দেখাল, তার পেছনে রয়েছে প্রায় ১৪ লাখ বছরের আলাদা বিবর্তনের ইতিহাস।
একটি দুর্ঘটনাজনিত উদ্ধার, একটি প্রাণী আশ্রয়কেন্দ্র, একজন গবেষকের সন্দেহ এবং প্রায় এক দশকের বংশগত গবেষণা শেষ পর্যন্ত বিজ্ঞানকে দিল নতুন একটি নাম-লেপার্ডাস টিলকায়ো।
কিন্তু প্রজাতিটির পরিচয় পাওয়াই শেষ নয়। বরং এখান থেকেই শুরু হচ্ছে আসল কাজ কতগুলো টিলকায়ো এখনো বেঁচে আছে, কোথায় তারা বাস করে এবং তাদের বনভূমি কতটা নিরাপদ এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা।
বিজ্ঞানীরা হয়তো শত বছর পর নতুন একটি বিড়াল আবিষ্কার করেছেন। এখন চ্যালেঞ্জ হলো, এই নতুন পরিচিত বিড়ালটি যেন পরবর্তী শতাব্দীর আগেই হারিয়ে না যায়।