মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তায় বাইরের হস্তক্ষেপ নয়: আরাঘচি

মধ্যপ্রাচ্যের টেকসই নিরাপত্তা বাইরের কোনো শক্তি চাপিয়ে দিতে পারে না, বরং পশ্চিম এশিয়ার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এই অঞ্চলের দেশগুলোকেই বলে মন্তব্য করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। তিনি বলেছেন, আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন ও অভিন্ন ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজস্ব সমাধান খুঁজে নিতে হবে।

শনিবার (১৮ সেপ্টেম্বর) ইন্দোনেশিয়ার বৈদেশিক নীতিবিষয়ক সংগঠন এফপিসিআই আয়োজিত গ্লোবাল টাউন হল ২০২৬-এর ভার্চুয়াল ফোরামে বক্তব্য দেওয়ার সময় এসব কথা বলেন আরাঘচি। ‘পাগলাটে হয়ে ওঠা বিশ্বে বৈশ্বিক মোড় পরিবর্তনের আহ্বান: উন্নয়নকে কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনা, মানবিকতা পুনরুদ্ধার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা’ শীর্ষক এই আয়োজনে তিনি বৈশ্বিক নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক আইন ও মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে ইরানের অবস্থান তুলে ধরেন।

আরাঘচি বলেন, বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধ, হস্তক্ষেপ, নিষেধাজ্ঞা ও শক্তি প্রয়োগ ব্যতিক্রমী বিষয় না থেকে নীতির নিয়মিত হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। কয়েক দশকের বিদেশি হস্তক্ষেপ, সামরিক চাপ ও মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ প্রমাণ করেছে যে সামরিক হস্তক্ষেপ নিরাপত্তা তৈরি করে না এবং চাপ ও জবরদস্তি শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। বরং এর ফলে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে যুদ্ধকে একটি প্রধান হাতিয়ার হিসেবে স্বাভাবিক করে তোলা হয়েছে এবং সংঘাতের ধারাবাহিকতা তৈরি হয়েছে।

ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী গাজা ও লেবাননের পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে বলেন, গাজায় চলমান ঘটনাগুলো শুধু মানবিক বিপর্যয় নয়, বরং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিবেক ও সম্মিলিত দায়িত্বেরও পরীক্ষা। বেসামরিক মানুষ হত্যা, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি, সম্মিলিত শাস্তি ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংসের মতো ঘটনা কার্যকর জবাবদিহি ছাড়াই লেবানন পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

আরাঘচির ভাষ্য, এমন একটি বিপজ্জনক ধারা তৈরি হয়েছে, যেখানে সামরিক শক্তি আর শেষ অবলম্বন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে না; বরং অঞ্চলটির রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামো পুনর্গঠনের স্থায়ী হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। এর ফলে আগ্রাসন স্বাভাবিক হয়ে উঠছে, উত্তেজনা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাচ্ছে এবং ধ্বংসযজ্ঞ রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের উপকরণে পরিণত হচ্ছে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী সামরিক আগ্রাসনকেও একই ধারার অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি এই যুদ্ধকে অবৈধ, অন্যায্য, আগ্রাসী ও উসকানিবিহীন বলে বর্ণনা করেন। ইরানি কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে হত্যাকাণ্ড, রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ ও ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হুমকি, জাতীয় সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন এবং আগ্রাসী কর্মকাণ্ডের দায়মুক্তির মতো বিষয়ও তিনি তাঁর বক্তব্যে তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, এসব কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে আন্তর্জাতিক আইনের নিষিদ্ধ সীমারেখাগুলো ধীরে ধীরে মুছে যাবে। এর পরিণতি হিসেবে মিনাবে ১৬৮ শিক্ষার্থীর নিহত হওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। নিহতদের কেবল যুদ্ধের পরিসংখ্যান হিসেবে না দেখে তাদের প্রত্যেকের পেছনে থাকা পরিবার ও ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করার আহ্বান জানান আরাঘচি।

আন্তর্জাতিক আইন ও বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, বড় শক্তিগুলোর স্বার্থ অনুযায়ী যখনই আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষা করা হবে, তখন আইনের শাসনের কথা বলা কঠিন হয়ে পড়বে। একইভাবে মানবাধিকার যদি কিছু দেশের জন্য সহজাত অধিকার এবং অন্যদের জন্য শর্তসাপেক্ষ সুবিধায় পরিণত হয়, তাহলে তাকে সর্বজনীন অধিকার বলা যায় না।

তবে এ পরিস্থিতির সমাধান হিসেবে বহুপক্ষীয় ব্যবস্থা পরিত্যাগের বিপক্ষে মত দেন আরাঘচি। তাঁর মতে, বর্তমান বিশ্বে প্রকৃত, কার্যকর ও ন্যায়ভিত্তিক বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার প্রয়োজন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। বিশ্বকে সামরিকতাবাদ থেকে টেকসই উন্নয়ন, হস্তক্ষেপবাদ থেকে জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান, সম্মিলিত শাস্তি থেকে বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা এবং দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ থেকে স্থায়ী শান্তির দিকে এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে আরাঘচি বলেন, টেকসই নিরাপত্তা এই অঞ্চলের বাইরে থেকে নির্ধারণ করা যাবে না। অঞ্চলটির নিরাপত্তা অঞ্চলটির দেশগুলোর নিজেদের বিষয় হওয়া উচিত। এসব দেশের নিজেদের নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন ও অভিন্ন ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করে বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপ ছাড়াই নিজেদের সমাধান খুঁজে নেওয়ার সক্ষমতা থাকতে হবে।

ইরানের ক্ষেত্রে এটি কেবল তাত্ত্বিক অবস্থান নয় বলেও উল্লেখ করেন আরাঘচি। তাঁর ভাষ্য, এটি ইরানের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া শিক্ষা। তাঁর মতে, সামরিক উপস্থিতি বা বিদেশি শক্তির ইচ্ছা চাপিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে নয়; বরং অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে সংলাপ, আস্থা তৈরি, সহযোগিতা ও পারস্পরিক সম্মানের মাধ্যমেই টেকসই নিরাপত্তা অর্জন সম্ভব।

বক্তব্যের শেষদিকে আরাঘচি বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন একটি ঐতিহাসিক ও সভ্যতাগত সিদ্ধান্তের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সামরিকতাবাদ, হস্তক্ষেপ, সংঘাত ও অনন্ত যুদ্ধের পথ অব্যাহত রাখা হবে, নাকি উন্নয়নকে আবারও কেন্দ্রে ফিরিয়ে এনে মানবিক মর্যাদাকে ক্ষমতার হিসাবের ওপরে স্থান দেওয়া হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এখনই বলে মন্তব্য করেন তিনি।  সূত্র: মেহর নিউজ এজেন্সি