যুদ্ধের মাঠে শক্তি পরীক্ষা দিয়েই এবার জাতিসংঘে গেলো ইরান

এবার বিশ্বের পরাক্রমশালী যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শক্তি পরীক্ষা দিয়েই জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিচ্ছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান। জাতিসংঘের পাঁচটি ভেটো প্রদানকারী পাঁচটি শক্তিধর দেশের চেয়েও এবার বিশেষ গুরুত্ব পাবে ইরানের এই প্রেসিডেন্ট। যুদ্ধের মাঠে ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রকে নাস্তানাবুদ করে ফেলেছে। ইরান হামলা করে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটি । যুদ্ধের অর্থনৈতিক ক্ষতির প্রভাব পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের ওপর। বেড়েছে তাদের জীবনযাত্রার ব্যয়, অস্ত্রভাণ্ডারেও পড়েছে টান।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী। তবে সাধারণ পরিষদের মঞ্চে ইরানের গুরুত্ব কোনো ভেটো ক্ষমতা থেকে আসছে না। বরং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের সরাসরি পক্ষ হিসেবে তেহরানের অবস্থান, হরমুজ প্রণালির ওপর সংঘাতের প্রভাব এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তৃত নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে ইরানের ভূমিকার কারণেই পেজেশকিয়ানের বক্তব্য এবার বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

পেজেশকিয়ানের নিউইয়র্ক সফর এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি কূটনৈতিক যোগাযোগের সম্ভাবনাও আলোচনায় রয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, জাতিসংঘের অধিবেশন ঘিরে সম্ভাব্য মার্কিন-ইরান আলোচনা নিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারও সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে আগ্রহের ইঙ্গিত দিয়েছেন।

অন্যদিকে ইরানও আলোচনার বিষয়ে বিভিন্ন শর্ত তুলে ধরেছে। ফলে জাতিসংঘের মঞ্চটি শুধু যুদ্ধের রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার জায়গা নয়, সম্ভাব্য কূটনৈতিক যোগাযোগেরও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় ধরনের সামরিক ও অর্থনৈতিক ব্যয় তৈরি করেছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ইরান যুদ্ধে মোট ব্যয় আনুমানিক ৪৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এর মধ্যে শুধু অস্ত্র ও গোলাবারুদ খাতেই ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৮ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার।

এর আগে পেন্টাগনের ইন্সপেক্টর জেনারেলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’-তে আনুমানিক ৩৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে। এর মধ্যে ২২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার গেছে গোলাবারুদে। প্রতিবেদনে এসব ব্যয়ের কারণে মার্কিন অস্ত্রভাণ্ডারে ‘স্ট্র্যাটেজিক ইনভেন্টরি শর্টফল’ এবং অস্ত্র উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

চলমান সংঘাতে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সামরিক স্থাপনা ও স্বার্থকে লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালিয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এসব হামলায় কয়েকটি মার্কিন ঘাঁটি ও সামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবরও পাওয়া গেছে। তবে ইরান যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলকে সম্পূর্ণভাবে ‘নাস্তানাবুদ’ বা সামরিকভাবে পরাজিত করেছে এমন দাবি স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করার মতো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।

বরং যুদ্ধের বাস্তব চিত্র হলো দুই পক্ষই হামলা, পাল্টা হামলা, ক্ষয়ক্ষতি ও সামরিক ব্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ পরিস্থিতি এবং সম্ভাব্য মার্কিন-ইরান আলোচনার খবরের সঙ্গে তেলের বাজারও ওঠানামা করছে।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক দিকগুলোর একটি হলো হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস সরবরাহের একটি বড় অংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে সেখানে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে শুধু যুক্তরাষ্ট্র বা ইরান নয়, এশিয়া, ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তায় তার প্রভাব পড়ে।

এই কারণে পেজেশকিয়ানের ভাষণে হরমুজ প্রণালি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ে ইরানের অবস্থান কী হয়, তা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।