ইসরায়েল এখন এক 'আঞ্চলিক হুমকি' হয়ে উঠেছে এবং তারা 'ভয়ংকর মাত্রার' দায়মুক্তি নিয়ে আচরণ করছে বলে মন্তব্য করেছেন জর্ডানের বাদশাহ দ্বিতীয় আবদুল্লাহ। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে ফিলিস্তিন প্রশ্নকেই তিনি কেন্দ্রে রাখেন।
সম্মেলনের উদ্বোধনী দিনে আবেগঘন এক ভাষণে বাদশাহ আবদুল্লাহ বলেন, বিশ্ব এখন ইতিহাসের এক 'অনন্য মুহূর্ত' পার করছে, যেখানে 'জ্ঞানের পরিধি আর পরিবর্তনের গতি নজিরবিহীন'। তিনি বলেন, 'প্রতিদিন নতুন কোনো সংকট, নতুন কোনো বিয়োগান্তক ঘটনা, নতুন কোনো জরুরি পরিস্থিতি আমাদের মনোযোগ দাবি করছে। প্রতিটি প্রজন্মই ভাবে তাদের সামনের চ্যালেঞ্জ অতুলনীয়-হয়তো আমাদের ক্ষেত্রেও তা সত্যি।'
বিশ্বজুড়ে 'মনোযোগ' এখন এক দুর্লভ ও মূল্যবান সম্পদে পরিণত হয়েছে বলে মন্তব্য করেন বাদশাহ। এই মনোযোগই ঠিক করে দেয়-কোন সংঘাত টেকসই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা পায় আর কোনটি আলোচনার টেবিল থেকে হারিয়ে যায়, ক্যামেরা সরে গেলে যুদ্ধবিরতি টিকে থাকে কি না, আর মানবিক সংকট অসহনীয় থেকে যায় নাকি তা 'স্বাভাবিক' বলে গণ্য হতে শুরু করে।
লেবানন, ইয়েমেন, সুদান ও ইরানের যুদ্ধের কথা উল্লেখ করে বাদশাহ বলেন, মধ্যপ্রাচ্য এখন দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা মানবিক দুর্ভোগ আরও গভীর করে তুলছে। তিনি বলেন, 'আমাদের অঞ্চলের কোনো সংকট শুধু এখানেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এ নিয়ে যদি কারও সংশয় থাকে, তাহলে মুম্বাই থেকে মাদ্রিদ কিংবা মিনেসোটা পর্যন্ত সাধারণ পরিবারগুলোর জ্বালানি ও মুদি বাজারের খরচের দিকে তাকালেই তা স্পষ্ট হবে। ইরান যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে, অস্থিরতা কতটা দ্রুত বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও মানুষের জীবনযাত্রাকে অঞ্চলের বাইরেও ব্যাহত করতে পারে।'
দশকের পর দশক উপেক্ষিত গাজা প্রশ্ন
গাজা প্রসঙ্গ টেনে বাদশাহ বলেন, 'কয়েক দশক ধরে আমি এই পরিষদের সামনে দাঁড়িয়ে ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংঘাত অমীমাংসিত রেখে দেওয়ার বিপদ নিয়ে সতর্ক করে এসেছি।' তাঁর মতে, সংঘাতের মুখোমুখি হয়ে তা সমাধানের বদলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বরাবরই একে 'নিয়ন্ত্রণে' রাখার পথ বেছে নিয়েছে। বিশ্বের দীর্ঘতম দখলদারিত্বগুলোর একটির প্রসঙ্গ টেনে তিনি প্রশ্ন তোলেন আন্তর্জাতিক আইনের বাস্তব মূল্য ও বৈধতা নিয়ে।
তিনি বলেন, 'দশকের পর দশক ধরে যদি আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষা করাই যায়, তাহলে সেই আইনের আসলে মূল্য কী? আর এর লঙ্ঘন চিহ্নিত করতেই যদি আমরা রাজি না হই, তাহলে তা কার্যকর করব কীভাবে? গাজায় প্রমাণ ভুরি ভুরি-তথাকথিত যুদ্ধবিরতির প্রথম ৩০০ দিনেই অন্তত ৩০০ ফিলিস্তিনি শিশু নিহত হয়েছে।'
'লক্ষ্য সরিয়ে নেওয়ার' জন্য ইসরায়েলি সরকারের সমালোচনা করেন বাদশাহ-হামলা চালিয়ে যাওয়া, বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড থেকে সেনা প্রত্যাহারে অস্বীকৃতির জন্য। এর ফলে গাজার জনগণ ভূখণ্ডের মাত্র এক-তৃতীয়াংশের মধ্যে বন্দি হয়ে পড়েছে বলে সতর্ক করেন তিনি।
এই পরিস্থিতিতে ইসরায়েলি নীতিকে আর 'সাময়িক সামরিক ব্যবস্থা' বা 'যুদ্ধের অনিবার্য পরিণতি' হিসেবে দেখার অবকাশ নেই বলে মন্তব্য করেন বাদশাহ। তিনি বলেন, 'জবাবদিহি তখনই শুরু হয়, যখন আমরা বিষয়টিকে তার প্রকৃত নামে ডাকি-ফিলিস্তিনি জীবন মুছে ফেলা এবং গাজায় নতুন ভৌগোলিক বাস্তবতা চাপিয়ে দেওয়ার একটি প্রচেষ্টা।'
পশ্চিম তীরে 'মৌলিক পরিবর্তন'
বিশ্বের নজর যখন গাজায় নিবদ্ধ, তখন পশ্চিম তীরে অত্যন্ত বিপজ্জনক কিছু ঘটে চলেছে বলে সতর্ক করেন বাদশাহ। তিনি বলেন, 'কেউ কেউ হয়তো ভাবছেন, এসব আমরা আগেও দেখেছি: বসতি স্থাপন, সহিংসতা, উচ্ছেদ-একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। কিন্তু বাস্তবতা তা নয়, এমনকি এটি নিছক কোনো উত্তেজনা-বৃদ্ধিও নয়। এটি একটি মৌলিক পরিবর্তন। যা একসময় ছিল ধীরে ধীরে এগিয়ে চলা এক প্রক্রিয়া, তা এখন আরও অনেক বেশি আগ্রাসী রূপে বিস্ফোরিত হয়েছে।'
ফিলিস্তিনিদের ওপর বসতি স্থাপনকারীদের হামলা এবং তাদের জমি-সম্পত্তি ধ্বংসের ঘটনা বৃদ্ধির কথা তুলে ধরেন বাদশাহ। দখলকৃত পশ্চিম তীরে নিয়ন্ত্রণ আরও 'শক্ত' করা, বসতি সম্প্রসারণ এবং ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদের চেষ্টা করছে ইসরায়েল, বলে জানান তিনি। তাঁর ভাষায়, 'ইসরায়েলি সেনারা পাশে দাঁড়িয়ে থাকে যখন বসতি স্থাপনকারীরা ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা চালায়-প্রায়ই হামলাকারীদের রক্ষা করে বা তাদের সঙ্গে যোগ দেয়। তারা আহতদের কাছে অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছাতে বাধা দিয়েছে। সত্য প্রকাশের চেষ্টা করা আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদেরও লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে। আর যখন সেনারা বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে সহিংসতা দেখেও চুপ থাকে, তাতে মদদ দেয়, কখনো কখনো নিজেরাও অংশ নেয়-তখন একে আর 'মুষ্টিমেয় দাঙ্গাকারীর' কাজ বলে চালানো যায় না।'
পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি তৎপরতাকে জোরপূর্বক উচ্ছেদের একটি নীতি হিসেবেই দেখা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি, এবং গাজা ও পশ্চিম তীরকে ফিলিস্তিনি জনগণের অবিভাজ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান জানান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি। তাঁর ভাষায়, গাজা ইতিমধ্যেই 'ধ্বংসপ্রাপ্ত' আর পশ্চিম তীর কার্যত 'সংযুক্ত'-যার ফলে একটি টেকসই ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠন অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
শান্তির প্রস্তাব বরাবরই ছিল আরব বিশ্বের পক্ষ থেকে
আরব বিশ্ব ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তি প্রত্যাখ্যান করেছে-এমন দাবি নাকচ করে দেন বাদশাহ আবদুল্লাহ। সৌদি আরবের নেতৃত্বে ২০০২ সালের আরব শান্তি উদ্যোগের কথা তুলে ধরে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, শান্তি ও ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের বিনিময়ে ৫৭টি আরব ও মুসলিম দেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে বরাবরই অস্বীকৃতি জানিয়ে এসেছে তেল আবিব।
তিনি বলেন, '২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে সেই প্রস্তাব অপরিবর্তিত রয়ে গেছে; বাধা কখনোই শান্তির অংশীদারের অভাব ছিল না, বাধা ছিল তা গ্রহণে ইচ্ছুক কোনো ইসরায়েলি সরকারের অনুপস্থিতি।' তিনি আরও বলেন, 'এই ইসরায়েলি সরকার মনোযোগের শক্তি বোঝে। আর সম্প্রতি তারা যে ধরনের মনোযোগ পাচ্ছে, তা তাদের পছন্দ হচ্ছে না। অন্যায়ের প্রমাণের মুখোমুখি হয়ে পথ পরিবর্তনের বদলে তারা বেছে নেয় দৃষ্টি ঘোরানো আর সমালোচকদের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করার কৌশল।'
তিনি হুঁশিয়ার করে বলেন, 'দৃষ্টি ঘোরানোর কৌশল আর কাজ করবে না; বিশ্বজুড়ে মানুষ এখন খেয়াল রাখছে। প্রশ্ন এখন একটাই: আমরা কি পদক্ষেপ নেব? কারণ বিশ্বের রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তা বিকল্পের অভাবে নয়-তাই একে তার প্রকৃত নামেই ডাকা উচিত: এটি একটি সিদ্ধান্ত।'
নিষেধাজ্ঞা, সম্পদ জব্দ, অবরোধ ও কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতার মতো যেসব হাতিয়ার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হাতে আছে, তার কথা তুলে ধরেন বাদশাহ। তবে ইসরায়েলের ক্ষেত্রে 'প্রস্তাবগুলো যেখানে শুরু হয়, সেখানেই শেষ হয়ে যায়... শুধু কাগজে', বলে তিনি সতর্ক করেন-যার চূড়ান্ত পরিণতি একটি 'লাগামহীন রাষ্ট্র'।
তিনি বলেন, 'এই সরকারের দায়মুক্তির বোধ এখন ভয়ংকর পর্যায়ে পৌঁছেছে- তারা আর নিজেদের জিজ্ঞেস করার প্রয়োজনই মনে করে না, ‘আমরা কি এটা করে পার পাব?’ তারা এর উত্তর আগেই জানে।'
সিরিয়া: 'বিশ্ব যে সতর্কবার্তা দেখতে চাইছে না'
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ধরে নেওয়া উচিত নয় যে ইসরায়েলের উচ্চাকাঙ্ক্ষা কেবল ফিলিস্তিনেই সীমাবদ্ধ, বলে সতর্ক করেন বাদশাহ। তাঁর ভাষায়, ইসরায়েলের সম্প্রসারণবাদী ক্ষুধাই তাকে একটি আঞ্চলিক হুমকিতে পরিণত করেছে।
তিনি বলেন, 'আজ সিরিয়াই সেই সতর্কবার্তা, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দেখতে চাইছে না- ধাপে ধাপে, হিসাব করেই ইসরায়েল পরীক্ষা করে দেখছে তারা কতদূর যেতে পারে। আর প্রতিবার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় চোখ ফিরিয়ে নিলেই ইসরায়েল শিখে নেয়, সীমান্তরেখা আর আইনি সীমা পেরিয়ে তারা আরও এগিয়ে যেতে পারে।'
তিনি বলেন, 'জর্ডান এটা ভালোভাবেই বোঝে। আমরা জানি এমন এক অঞ্চলে বাস করার অর্থ কী, যেখানে আগের সংকট মিটতে না মিটতেই নতুন সংকট এসে হাজির হয়-আর আমরা এটাও জানি যে, সামনের জরুরি পরিস্থিতির জবাব দেওয়া আর ভবিষ্যৎ গড়ার মধ্যে আমাদের বেছে নেওয়ার সুযোগ নেই।'
ন্যায্য শান্তির প্রতি প্রতিশ্রুতি থেকে জর্ডান কখনো সরে আসবে না এবং ফিলিস্তিনি জনগণের স্থিতিস্থাপকতাকে সবসময় সমর্থন করে যাবে বলে জানান বাদশাহ আবদুল্লাহ। জেরুজালেমের মুসলিম ও খ্রিস্টান পবিত্র স্থানগুলোর ঐতিহাসিক ও আইনি অবস্থা বজায় রাখার প্রতিও জর্ডানের অঙ্গীকারের কথা জানান তিনি।
জর্ডান এমন একটি দেশ হতে চায়, যার ওপর বিশ্ব ভরসা করতে পারে-'নিজেদের নীতির প্রতি সৎ, নিজেদের কথার প্রতি সৎ, সবার সঙ্গে কথা বলতে প্রস্তুত এবং শান্তি চায় এমন যে কারও সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত', বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি শেষে বলেন, 'গাজা, সুদান, ইউক্রেন-যেখানেই মানুষ যুদ্ধ, উচ্ছেদ আর ভয়ের মধ্যে বাস করুক না কেন, সংকট কয়েক সপ্তাহ আগে শুরু হোক বা কয়েক দশক ধরে চলতে থাকুক, বিশ্বের মনোযোগের ওঠানামার সঙ্গে আমাদের নীতি বদলাতে পারে না। মনোযোগের জন্য প্রতিযোগিতার এই বিশ্বে, আমরা কোথায় মনোযোগ দিচ্ছি, তা নিয়ে আমাদের সচেতন হতে হবে হ্নে, আর কী আমাদের মনোযোগ সরাতে চাইছে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। ভবিষ্যৎ গঠিত হয় শুধু আমরা কী করি তার ওপর নয়, বরং আমরা কী উপেক্ষা করতে বেছে নিই, তার ওপরও।'
সূত্র: আরব নিউজ