ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত ও হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনার মধ্যেও প্রতিদিন ১০ থেকে ১৭ মিলিয়ন ব্যারেল পর্যন্ত তেল এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে পরিবহন হচ্ছে বলে দাবি করেছেন মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট। তাঁর ভাষ্য, মার্কিন নৌবাহিনীর সহায়তায় তেলবাহী জাহাজগুলো হরমুজ প্রণালি পার হচ্ছে।
বুধবার ফক্স নিউজের ‘স্পেশাল রিপোর্ট’ অনুষ্ঠানে বেসেন্ট বলেন, সংঘাত শুরুর আগে প্রতিদিন প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো। বর্তমানে বিকল্প রুটসহ বিভিন্ন ব্যবস্থার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ তেল আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছাচ্ছে।
তবে হরমুজ দিয়ে প্রকৃত তেল প্রবাহের পরিমাণ নিয়ে বিভিন্ন উৎসের তথ্যে পার্থক্য রয়েছে। জাহাজের গতিবিধি ও উপগ্রহভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দৃশ্যমান জাহাজ চলাচল মার্কিন প্রশাসনের দাবির তুলনায় অনেক কম হতে পারে। কিছু জাহাজ স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থা (এআইএস) বন্ধ রাখায় প্রকৃত তেল প্রবাহের পরিমাণ নির্ণয়ও কঠিন হয়ে পড়েছে।
বেসেন্ট বলেন, হরমুজ দিয়ে চলাচলের সময় কিছু তেলবাহী জাহাজ হামলার শিকার হলেও অনেক জাহাজ তাদের যাত্রা অব্যাহত রাখছে।
তিনি বলেন, ইরান কয়েকটি ড্রোন ব্যবহার করে জলপথ দিয়ে যাওয়া জাহাজকে লক্ষ্য করার চেষ্টা করতে পারে। এ পরিস্থিতিতে মার্কিন নৌবাহিনী তেল পরিবহন সচল রাখতে কাজ করছে বলে দাবি করেন তিনি।
এর আগে আগস্টেও মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, ওমান উপকূলঘেঁষা একটি দক্ষিণ করিডোর ব্যবহার করে প্রতিদিন প্রায় ১০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল হরমুজ থেকে বের করে আনার একটি মার্কিন-সমর্থিত ব্যবস্থা চালু রয়েছে। ওই ব্যবস্থায় প্রতি রাতে ১৫ থেকে ২০টি ট্যাংকার হরমুজ অতিক্রম করছিল বলে জানিয়েছিল অ্যাক্সিওস।
যুদ্ধের আগে প্রতিদিন ২০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। সংঘাতের আগে প্রতিদিন প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল এই জলপথ দিয়ে যেত বলে বেসেন্ট জানিয়েছেন।
তবে সংঘাত শুরু হওয়ার পর বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। রয়টার্সের সাম্প্রতিক জাহাজ চলাচলসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, ২২ সেপ্টেম্বর হরমুজ দিয়ে মাত্র দুটি পণ্যবাহী জাহাজ অতিক্রম করেছে। সংঘাতের আগে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১২৫টি বড় বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করত। যদিও এআইএস বন্ধ রাখা জাহাজ এসব পরিসংখ্যানে ধরা নাও পড়তে পারে।
অর্থাৎ তেল পরিবহনের ক্ষেত্রে মার্কিন প্রশাসনের দেওয়া হিসাব এবং দৃশ্যমান জাহাজ চলাচলের তথ্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে।
বিকল্প পথে যাচ্ছে আরও তেল
বেসেন্টের বক্তব্য অনুযায়ী, যুদ্ধের আগে হরমুজ দিয়ে যাওয়া তেলের একটি অংশ এখন বিকল্প স্থলপথ ও পাইপলাইন ব্যবহার করে পরিবহন করা হচ্ছে। তাঁর দাবি, প্রায় ৩ মিলিয়ন ব্যারেল তেল বিকল্প রুট দিয়ে যাচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ দীর্ঘদিন ধরেই হরমুজের ওপর নির্ভরতা কমাতে পাইপলাইন ও স্থলভিত্তিক পরিবহন অবকাঠামো বাড়ানোর চেষ্টা করছে। বেসেন্ট এর আগে বলেছিলেন, নতুন পাইপলাইন তৈরি হলে আগামী দুই বছরের মধ্যে হরমুজের তেল পরিবহনের কৌশলগত গুরুত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।
তবে এ ধরনের বিকল্প রুট হরমুজকে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করতে পারবে কি না, তা নিয়ে জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কারণ তেল ছাড়াও হরমুজ দিয়ে বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস ও অন্যান্য পণ্য পরিবহন করা হয়।
তেলবাজারে প্রভাব
হরমুজে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ার আশঙ্কায় সংঘাতের বিভিন্ন পর্যায়ে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বেড়েছে। ১৪ সেপ্টেম্বর ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৭ ডলারের ওপরে উঠেছিল। একই সময়ে মার্কিন প্রশাসন দাবি করছিল, হরমুজ দিয়ে আরও বেশি তেল পরিবহন করা সম্ভব হচ্ছে।
বেসেন্টের বক্তব্য, তেল সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ না হওয়ায় এবং বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি বাজারে আসতে থাকায় তেলের দাম বসন্তকালের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে কমেছে।
তবে বাজারে এখনো বড় ধরনের অনিশ্চয়তা রয়েছে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তেল সরবরাহ, জাহাজের বীমা, পরিবহন ব্যয় এবং এশিয়ার আমদানিকারক দেশগুলোর জ্বালানি নিরাপত্তায় নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।
রয়টার্সের বিশ্লেষণেও দেখা গেছে, উপসাগরীয় দেশগুলো হরমুজের বিকল্প হিসেবে জটিল ‘শাটলিং’ ব্যবস্থা ব্যবহার করে তেল রপ্তানি চালু রাখার চেষ্টা করছে। তবে এই ব্যবস্থা ব্যয়বহুল এবং দীর্ঘমেয়াদে কতটা কার্যকর হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
ইরানের ওপর ‘অর্থনৈতিক চাপ’
বেসেন্ট হরমুজে তেল চলাচলের পাশাপাশি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপের কথাও তুলে ধরেছেন।
ট্রাম্প প্রশাসন ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ নামে যে নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক চাপের কর্মসূচি চালাচ্ছে, বেসেন্ট সেটিকে ইরানের ওপর নজিরবিহীন অর্থনৈতিক চাপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
এর আওতায় ইরানের তেল রপ্তানি, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক এবং নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে বাণিজ্য পরিচালনায় সহায়তাকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য করা হচ্ছে। বেসেন্ট এর আগে বলেছিলেন, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও নৌ অবরোধের কারণে চীনের কাছে বিক্রির জন্য ইরানের হাতে থাকা অপরিশোধিত তেলের পরিমাণও দ্রুত কমছে।
ফক্স নিউজকে দেওয়া আরেক সাক্ষাৎকারে বেসেন্ট দাবি করেছিলেন, সংঘাত শেষ হলে বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ আসায় তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৪০ থেকে ৫০ ডলারে নেমে আসতে পারে। তবে এটি তাঁর পূর্বাভাস, নিশ্চিত বাজার পরিস্থিতি নয়।
হরমুজের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পাল্টাপাল্টি দাবি
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের অবস্থান পরস্পরবিরোধী। ইরান জলপথে নির্দিষ্ট নৌচলাচল ব্যবস্থা আরোপের চেষ্টা করেছে এবং অনুমোদন ছাড়া চলাচলকারী জাহাজকে সতর্ক করেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছে, তারা আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ সচল রাখতে নিরাপদ নৌপথ তৈরির চেষ্টা করছে।
এই পরিস্থিতিতে হরমুজের প্রকৃত তেল প্রবাহের পরিমাণ নিয়ে নির্ভরযোগ্য হিসাব করা কঠিন হয়ে পড়েছে। কারণ একদিকে কিছু জাহাজের এআইএস বন্ধ থাকায় উপগ্রহভিত্তিক ট্র্যাকিং অসম্পূর্ণ, অন্যদিকে মার্কিন প্রশাসনের দেওয়া হিসাবের সঙ্গে স্বাধীন জাহাজ চলাচলসংক্রান্ত তথ্যের পার্থক্য রয়েছে।
সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল চলাচল আংশিকভাবে সচল রাখা গেলেও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা এখনো অনিশ্চিত। জাহাজে হামলার ঝুঁকি, সামরিক উত্তেজনা, বীমা ব্যয় এবং বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা সবকিছু মিলিয়ে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে চাপ অব্যাহত রয়েছে।
একদিকে ওয়াশিংটন বলছে, তাদের নৌবাহিনী ও বিকল্প রুটের মাধ্যমে তেল সরবরাহ চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে। অন্যদিকে সাম্প্রতিক জাহাজ চলাচলসংক্রান্ত তথ্য দেখাচ্ছে, হরমুজে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল এখনো সংঘাত-পূর্ব পর্যায়ের তুলনায় অত্যন্ত কম।
ফলে বেসেন্টের ১০ থেকে ১৭ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পরিবহনের দাবি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর পুরো চিত্র বুঝতে হলে জাহাজ চলাচল, এআইএস তথ্য, বিকল্প রুট এবং তেল উৎপাদক দেশগুলোর প্রকৃত রপ্তানি সবগুলো সূচক একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
হরমুজ ঘিরে সংঘাত যত দীর্ঘ হবে, ততই স্পষ্ট হবে বিশ্ব জ্বালানি বাজার এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের ওপর নির্ভরতা কতটা কমাতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রের দাবি অনুযায়ী বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থা বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়।