চীনা গোষ্ঠীগুলোর সরবরাহ করা স্যাটেলাইট চিত্র ও গোয়েন্দা তথ্য ইরানের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক গোয়েন্দা মূল্যায়নে উঠে এসেছে। এসব তথ্যের সহায়তায় ইরান মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে আরও নির্ভুল হামলা চালানোর পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ শনাক্ত ও লক্ষ্যবস্তু করার সক্ষমতা বাড়িয়েছে বলে মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে জানিয়েছে সিএনএন।
চারটি সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত জুলাইয়ে জর্ডানে একটি মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের হামলাতেও চীনা গোয়েন্দা সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ওই হামলায় তিন মার্কিন সেনা নিহত হন। মার্কিন কর্মকর্তাদের ধারণা, চীনা তথ্যের সহায়তা ছাড়া ওই মাত্রার নির্ভুলতা অর্জন করা ইরানের পক্ষে কঠিন ছিল।
হরমুজ প্রণালিতেও একই ধরনের তথ্য ব্যবহার করে ইরান মার্কিন নৌবহরের গতিবিধি ও বাণিজ্যিক জাহাজের অবস্থান আরও কার্যকরভাবে অনুসরণ করতে পারছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। চীনা ভূ-স্থানিক তথ্যের সহায়তায় ইরান অপেক্ষাকৃত সাধারণ প্রযুক্তির তাপ-অনুসরণকারী চালকবিহীন বিমানও নির্দিষ্ট সময়ে উৎক্ষেপণ করছে। এসব চালকবিহীন বিমান আকাশে চলার সময় নতুন করে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। ফলে জাহাজের অবস্থান ও সময়ের হিসাব করে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক চালকবিহীন বিমান ছোড়া হচ্ছে।
এক মার্কিন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক এক নৌ-এসকর্ট অভিযানে মার্কিন বাহিনী এক ডজনের বেশি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রায় ২০টি চালকবিহীন বিমান ভূপাতিত করে। একই সময়ে হরমুজ প্রণালির আশপাশে প্রায় ৬০টি লক্ষ্যবস্তুতে আক্রমণাত্মক অভিযানও চালানো হয়।
তবে ইরানের সামরিক সক্ষমতা বাড়ার পেছনে শুধু চীনা সহায়তাকেই একমাত্র কারণ হিসেবে দেখছেন না মার্কিন কর্মকর্তারা। রাশিয়ার সহায়তা, ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন বিমানের দিকনির্দেশনা ব্যবস্থায় কারিগরি উন্নয়ন এবং চলমান সংঘাতে ইরানি বাহিনীর অর্জিত যুদ্ধ-অভিজ্ঞতাকেও গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
চীনের সহায়তার পরিমাণ নিয়েও মার্কিন কর্মকর্তাদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। বেইজিং সরাসরি এই সহায়তার নির্দেশ দিয়েছে, নাকি বিষয়টি নীরবে অনুমোদন করছে, তা স্পষ্ট নয়। তবে মার্কিন কর্মকর্তাদের একজন বলেছেন, হরমুজ প্রণালিতে অস্থিতিশীলতার কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় চীনও পরিস্থিতির অবসান চায় বলে সাম্প্রতিক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে ইঙ্গিত রয়েছে।
এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র চীনা বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট থেকে মধ্যপ্রাচ্যের ছবি পাওয়ার বিষয়টি ঠেকাতে পদক্ষেপ নিয়েছে। মে মাসে তিনটি চীনা স্যাটেলাইট কোম্পানির ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় ট্রাম্প প্রশাসন। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এসব কোম্পানির সরবরাহ করা চিত্র ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে হামলা চালাতে সহায়তা করেছে।
মার্কিন কর্মকর্তারা আরও বলছেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইরান তার কৌশলও বদলাচ্ছে। নিম্ন ও মাঝারি উচ্চতায় উড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন বিমান মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বলতা নতুন করে সামনে এসেছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি মার্কিন সামরিক ও কূটনৈতিক স্থাপনায় অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করতে হচ্ছে।
পেন্টাগনের মহাপরিদর্শকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের প্রথম কয়েক মাসে ইরানের হামলায় কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ইরাক, ওমান ও জর্ডানে থাকা মার্কিন ঘাঁটির শত শত ভবন ও স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। এসব হামলার পর মার্কিন কেন্দ্রীয় কমান্ড অঞ্চলটিতে সেনা, সামরিক সরঞ্জাম ও সংরক্ষণাগারের অবস্থান পরিবর্তন করেছে।
ইরানের সামরিক ও শিল্প সক্ষমতা পুনর্গঠনের বিষয়টিও মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে চীন থেকে পাওয়া দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য যন্ত্রাংশ ইরানকে দ্রুত সামরিক মজুত ও উৎপাদন সক্ষমতা পুনর্গঠনে সহায়তা করছে বলে এক মার্কিন কর্মকর্তা দাবি করেছেন। তবে আরেক কর্মকর্তা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গ সামরিক অভিযান বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্তও ইরানকে তার সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠনের সুযোগ দিয়েছে। সূত্র: সিএনএন