যুদ্ধ শুরু হলে ভারত মহাসাগরেও মার্কিন জাহাজে হামলা হবে: ইরান

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে ভারত মহাসাগর পর্যন্ত মার্কিন যুদ্ধজাহাজে হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)।

ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ফার্সের বরাতে জানা গেছে, আইআরজিসি নৌবাহিনীর রাজনৈতিকবিষয়ক উপপ্রধান আলী মোহাম্মাদি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি হরমুজ প্রণালিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন বলে দাবি করে, তাহলে মার্কিন যুদ্ধজাহাজকে সেখানে পাঠিয়ে তা প্রমাণ করার আহ্বান জানিয়েছে তেহরান।

মোহাম্মাদি বলেন, “ট্রাম্প যদি মনে করেন হরমুজ প্রণালি তাঁর প্রণালি, তাহলে তাঁর জাহাজ ও নৌযানগুলো এখানে কেন নেই?”

তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি জলপথটির ওপর নিয়ন্ত্রণের দাবি করে, তাহলে একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজকে হরমুজের কাছাকাছি পাঠানো উচিত।

আইআরজিসির এই কর্মকর্তা বলেন, নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে মার্কিন নৌবহর ইরানের আঘাতের আওতার বাইরে থাকবে না।

তাঁর ভাষায়, “আরেকটি যুদ্ধ শুরু হলে আমরা নিঃসন্দেহে তাদের জাহাজ ও ডেস্ট্রয়ারে হামলা চালাব এবং ভারত মহাসাগরেও সেগুলো ধ্বংস করব।”

মোহাম্মাদির বক্তব্যের মাধ্যমে ইরান যে সম্ভাব্য সংঘাতের ভৌগোলিক পরিসর শুধু পারস্য উপসাগর বা হরমুজ প্রণালিতে সীমাবদ্ধ রাখার কথা ভাবছে না, বরং ভারত মহাসাগর পর্যন্ত মার্কিন নৌবাহিনীকে লক্ষ্য করার হুমকি দিচ্ছে—তা স্পষ্ট হয়েছে।

তবে এটি একজন ইরানি সামরিক কর্মকর্তার বক্তব্য। ইরান বাস্তবে ভারত মহাসাগরে মার্কিন যুদ্ধজাহাজে হামলা চালানোর সক্ষমতা বা পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত কোনো তথ্য দেননি।

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও বাণিজ্যিক নৌপথ হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে।

ইরান বলছে, প্রণালিটির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এবং নির্দিষ্ট শর্ত ছাড়া সব ধরনের জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার বিষয়ে তারা সম্মত নয়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ দিয়ে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছে।

সাম্প্রতিক সময়ে ইরানি বাহিনী মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজ লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে বলে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করেনি। ইরানের সামরিক বিশ্লেষণে এসব হামলাকে মার্কিন নৌ অবরোধ মোকাবিলার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখা হয়েছে।

হরমুজ নিয়ে সামরিক উত্তেজনার সরাসরি প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্যে। রয়টার্সের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, সংঘাতের মধ্যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশন বা আইএমও জানিয়েছে, হরমুজ ও আশপাশের অঞ্চলে প্রায় ২০ হাজার নাবিক চলমান পরিস্থিতির কারণে প্রভাবিত হচ্ছেন। সংস্থাটি জলপথটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

অন্যদিকে জাহাজ চলাচলের পরিসংখ্যান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও বাণিজ্যিক শিপিং ট্র্যাকারগুলোর তথ্যের মধ্যেও পার্থক্য রয়েছে। আল জাজিরার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মার্কিন কর্মকর্তারা প্রতিদিন কয়েক ডজন জাহাজ চলাচলের কথা বললেও স্বাধীন জাহাজ ট্র্যাকিং তথ্যের হিসাবে সংখ্যা অনেক কম।

আলী মোহাম্মাদির সর্বশেষ হুমকি এমন সময়ে এসেছে, যখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগের পাশাপাশি সামরিক উত্তেজনাও অব্যাহত রয়েছে।

ইরান এর আগে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক চাপ কমালে এবং নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করলে সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে তারা প্রস্তুত। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার কথা জানিয়েছেন। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, তেহরান এখনো মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের আনুষ্ঠানিক অবস্থানের অপেক্ষায় রয়েছে।

এই অবস্থায় আইআরজিসির নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে ভারত মহাসাগর পর্যন্ত মার্কিন জাহাজে হামলার হুমকি পরিস্থিতির ঝুঁকিকে আরও বিস্তৃত করার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

তবে নতুন যুদ্ধ শুরু হবে কি না কিংবা ইরানের এই হুমকি বাস্তবে কী ধরনের সামরিক পদক্ষেপে রূপ নেবে—তা এখনো অনিশ্চিত। আপাতত বক্তব্যটি তেহরানের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে দেওয়া একটি কঠোর সামরিক সতর্কবার্তা হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।