যুদ্ধের ক্ষতের মাঝেই স্কুলে ফিরছে ইরানের শিশুরা

যুদ্ধের ক্ষত এখনো শুকায়নি, তার মধ্যেই ইরানে আবার শ্রেণিকক্ষে ফিরছে শিশুরা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার কারণে মাসের পর মাস অনলাইনে পড়াশোনা করার পর গত সপ্তাহে নতুন শিক্ষাবর্ষে সশরীরে ক্লাস শুরু হয়েছে। তবে দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে নতুন করে হামলার আশঙ্কায় স্কুল-কলেজের পাঠদান এখনো অনলাইনে রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

যুদ্ধের ভয়াবহতার সবচেয়ে বড় স্মৃতিগুলোর একটি হয়ে আছে দক্ষিণ ইরানের হরমুজগান প্রদেশের মিনাব শহরের শাজারেহ-ই তায়্যেবেহ প্রাথমিক বিদ্যালয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিনেই হামলায় বিদ্যালয়টি ধ্বংস হয়। নিহত হয় অন্তত ১২০ শিশু ও ৩৫ জন প্রাপ্তবয়স্ক। তিন মাস পর বিদ্যালয়ের জায়গায় নতুন ভবন তৈরি হলেও সেখানে এখনো স্বাভাবিক পরিবেশ ফেরেনি। নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরুতে শিশুরা মাত্র এক ঘণ্টার মতো বিদ্যালয়ে গিয়ে ঘণ্টা বাজিয়ে ফিরে আসছে।

২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরুর পর দেশটির সব স্কুল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। পরে অনলাইনে পাঠদান চালু করা হয়। যুদ্ধবিরতির পর শিক্ষার্থীরা আবার শ্রেণিকক্ষে ফিরলেও মিনাবসহ দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি প্রদেশে নতুন করে মার্কিন হামলার আশঙ্কায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রথম দুই সপ্তাহ অনলাইনে পাঠদানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

মিনাবের সেই হামলার দিনের স্মৃতি এখনো তাড়া করে বেড়ায় বহু পরিবারকে। যুদ্ধ শুরুর দিন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছিল। সে সময় বিদ্যালয়ের কাছে পরপর দুটি হামলায় প্রাণ হারায় অন্তত ১২০ শিশু ও ৩৫ জন প্রাপ্তবয়স্ক। সন্তানদের খোঁজে সেদিন যানজটে আটকে পড়া রাস্তায় ছুটছিলেন উদ্বিগ্ন বাবা-মায়েরা। কেউ গাড়ি রাস্তায় ফেলে হেঁটেই বিদ্যালয়ের দিকে ছুটেছিলেন, কেউ একের পর এক ফোন করছিলেন স্কুলে।

তেহরানের ১১ বছর বয়সী এক শিশুর বাবা মেইসাম বলেন, যুদ্ধ আবার শুরু হলে স্কুল থেকে সন্তানকে নিয়ে যেতে বলা হলে কত সময় লাগবে, এই দুশ্চিন্তা এখনো তাকে তাড়া করে। সন্তানকে স্কুলে রেখে কর্মস্থলে ফেরার সময়ও তার মনে হয়, আবার যুদ্ধ শুরু হয়ে কোনো ক্ষেপণাস্ত্র বিদ্যালয়ে আঘাত করতে পারে।

মিনাবের শিক্ষক ৩৯ বছর বয়সী ফারামার্জ সেই হামলায় স্ত্রী ও এক সন্তানকে হারিয়েছেন। তার ভাষায়, চার সদস্যের পরিবারটির জীবন বিদ্যালয়কে ঘিরেই ছিল; এখন সেই পরিবারের অর্ধেকই নেই। নিহত সাত বছর বয়সী মেয়ের স্কুলব্যাগে ছিল শুধু কিছু স্বপ্ন, যেগুলো এখন আর কখনো পূরণ হবে না। স্কুল আবার খুললেও তার নিজের জীবনে আর স্বাভাবিকতা ফিরবে না বলেও জানান তিনি।

যুদ্ধের প্রভাব শুধু শ্রেণিকক্ষের বাইরে নয়, শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরেও গভীর ছাপ ফেলেছে। ইরানের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের সময় দেশটির ১ হাজার ২৮৮টি স্কুল প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক বিদ্যালয় মেরামত করা হয়েছে এবং নতুন শ্রেণিকক্ষও নির্মাণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সম্ভাব্য নতুন সংঘাতের কথা মাথায় রেখে অনলাইন পাঠদানের অবকাঠামো আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে।

তবে দীর্ঘদিন অনলাইনে পড়াশোনার কারণে শিক্ষার্থীদের ওপর এর প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তেহরানের এক উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক আমির জানান, গত শিক্ষাবর্ষের নয় মাসের মধ্যে চার মাসই যুদ্ধের কারণে অনলাইনে ক্লাস নিতে হয়েছে। এতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক দুর্বল হয়েছে এবং শিশুদের নিয়মিত শিক্ষাজীবনে ফেরানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

শিক্ষকদের আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো, যুদ্ধ ফের শুরু হলে অনলাইনে পাঠদান চালু করতে হতে পারে। তেহরানের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক জেইনাব বলেন, আকাশে যুদ্ধবিমানের শব্দ শোনা গেলে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। অনলাইনে ক্লাস ফিরলে যেসব শিক্ষার্থীর ইন্টারনেট সুবিধা নেই, তারাও আবার শিক্ষা থেকে ছিটকে পড়তে পারে।

নতুন শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিনে প্রকাশিত একটি ভিডিওতেও যুদ্ধের সেই ক্ষত ফুটে উঠেছে। শাজারেহ-ই তায়্যেবেহ বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী তার হারিয়ে যাওয়া বন্ধুদের কথা বলতে গিয়ে জানায়, তারা আর ক্লাসে ফিরবে না। কাছের বাড়িতে থাকা বন্ধুদের আর দেখতে না পাওয়ার কষ্টের কথাও বলে শিশুটি।

ইরানে তাই স্কুলের দরজা আবার খুলেছে, ঘণ্টাও বেজেছে। কিন্তু যুদ্ধের আতঙ্ক, হারানো সহপাঠীদের স্মৃতি আর নতুন হামলার আশঙ্কা এখনো শিশুদের শিক্ষাজীবনের সঙ্গে মিশে আছে। সূত্র: আলজাজিরা