ইরাক থেকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক জোটের সব সেনা প্রত্যাহার সম্পন্ন হওয়ার পর নিরাপত্তা শঙ্কায় পড়েছে দেশটির উত্তরাঞ্চলের স্বায়ত্তশাসিত কুর্দি অঞ্চল। কুর্দি কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, মার্কিন সামরিক উপস্থিতি পুরোপুরি শেষ হয়ে যাওয়ায় ইরবিলসহ কুর্দি অঞ্চলের ওপর সম্ভাব্য হামলা মোকাবিলার সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, নজরদারি ও গোয়েন্দা সহায়তা না থাকায় নতুন ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) মার্কিন ও ইরাকি সামরিক কর্মকর্তারা ইরাক থেকে জোটের সব সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। সর্বশেষ ধাপে উত্তর ইরাকের কুর্দি অঞ্চলের রাজধানী ইরবিল থেকেও মার্কিন সেনাদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ২০০৩ সালে শুরু হওয়া ইরাকে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের অবসান হলো।
কুর্দিস্তান আঞ্চলিক সরকারের প্রধানমন্ত্রী মাসরুর বারজানি সাম্প্রতিক এক বক্তব্যে বলেন, কুর্দি অঞ্চলের ওপর হুমকি বাস্তব এবং তারা ইতোমধ্যে হামলার শিকার হয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরিয়ে নেওয়ার পর যথাযথ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ছাড়া কুর্দি অঞ্চলকে একা ফেলে যাওয়ার বিষয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরবিলভিত্তিক প্যাট্রিয়ট ও সি-র্যাম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও প্রত্যাহার করা হয়েছে।
মার্কিন সেনা প্রত্যাহার অবশ্য একদিনে হয়নি। চলতি বছরের শুরুতে ইরাকের মধ্য ও পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন ঘাঁটি থেকে জোটের সেনাদের সরিয়ে উত্তর ইরাকের স্বায়ত্তশাসিত কুর্দি অঞ্চলের রাজধানী ইরবিলে কেন্দ্রীভূত করা হয়েছিল। এরপর সর্বশেষ ধাপে ইরবিল থেকেও মার্কিন সেনাদের প্রত্যাহার করা হয়।
মার্কিন বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে ইরাকি নিরাপত্তা বাহিনীকে শুধু সামরিক প্রশিক্ষণই দেয়নি, ইসলামিক স্টেটের অবশিষ্ট সদস্যদের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা তথ্য, আকাশ নজরদারি ও প্রযুক্তিগত সহায়তাও দিয়েছে। এখন এসব সক্ষমতার বড় অংশ ইরাকের নিজস্ব নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর নির্ভর করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য জানিয়েছে, সেনা প্রত্যাহারের পরও ইরাককে সীমিত প্রশিক্ষণ ও গোয়েন্দা সহায়তা দেওয়া অব্যাহত থাকতে পারে।
এখানেই আরেকটি বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে ইসলামিক স্টেটের সম্ভাব্য পুনর্গঠন নিয়ে। সংগঠনটি ২০১৭ সালে ইরাকের অধিকাংশ ভূখণ্ড থেকে উৎখাত হলেও তাদের স্লিপার সেল এখনো সক্রিয় বলে ইরাকি ও কুর্দি নিরাপত্তা কর্মকর্তারা মনে করেন। মার্কিন গোয়েন্দা ও নজরদারি সহায়তা কমে গেলে এসব গোষ্ঠী নিরাপত্তার ফাঁক কাজে লাগানোর সুযোগ পেতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে জাতীয় সার্বভৌমত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে দেখছে বাগদাদ। দেশটিতে কয়েক দিন ধরে সার্বভৌমত্ব দিবস পালনের প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে। ইরানঘনিষ্ঠ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোও মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে নিজেদের দীর্ঘদিনের দাবির সাফল্য হিসেবে দেখছে এবং এটিকে বিজয় হিসেবে উদযাপন করছে।
তবে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি শেষ হওয়ার পর ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মার্কিন বাহিনী না থাকায় এসব গোষ্ঠী রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সিদ্ধান্ত গ্রহণে নিজেদের ভূমিকা আরও বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারে। তবে এ বিষয়ে ভবিষ্যৎ পরিস্থিতিই চূড়ান্ত ভূমিকা রাখবে।
ইরাকি প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জায়েদি একই সময়ে দেশের সব অস্ত্র রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আনার উদ্যোগ এগিয়ে নিচ্ছেন। তবে কয়েকটি শক্তিশালী ইরানঘনিষ্ঠ গোষ্ঠী এখনো অস্ত্র সমর্পণে অনিচ্ছুক। ফলে একদিকে বিদেশি সেনা প্রত্যাহার, অন্যদিকে রাষ্ট্রের বাইরে থাকা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা, দুই প্রক্রিয়া একই সময়ে ইরাকের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নতুন পরীক্ষার মুখে ফেলেছে।
২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইরাকে সামরিক অভিযান শুরু হয়েছিল। ২০১১ সালে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার হলেও ২০১৪ সালে ইসলামিক স্টেটের উত্থানের পর তারা আবার ইরাকে ফিরে আসে। এবার সেই দ্বিতীয় পর্যায়ের সামরিক উপস্থিতিও শেষ হলো।
ফলে ইরাক এখন এমন এক নিরাপত্তা বাস্তবতার দিকে যাচ্ছে, যেখানে দেশের নিরাপত্তার প্রধান দায়িত্ব নিজেদের বাহিনীকেই নিতে হবে। আর কুর্দি অঞ্চলের জন্য এর তাৎক্ষণিক প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা, নজরদারি ও গোয়েন্দা সহায়তা ছাড়া সম্ভাব্য হামলা ও নিরাপত্তা হুমকি কতটা কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে পারবে তারা।
কুর্দি অঞ্চল, ইসলামিক স্টেটের অবশিষ্ট নেটওয়ার্ক এবং ইরানঘনিষ্ঠ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ভূমিকা, এই তিনটি বিষয়ই এখন মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর ইরাকের নতুন নিরাপত্তা বাস্তবতার গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে উঠেছে।