তেহরানের আকাশে তখন যুদ্ধের আগুন। একের পর এক বিস্ফোরণে কেঁপে উঠছে রাজধানী। ধোঁয়ায় ঢেকে যাচ্ছে শহরের আকাশ। কোথাও ধ্বংসস্তূপ, কোথাও ভেঙে পড়া ভবন, কোথাও আহতদের আর্তনাদ। আর সেই ভয়াবহতার মধ্যেই ইরানের ক্ষমতার শীর্ষে তৈরি হচ্ছিল এক অভূতপূর্ব উত্তরাধিকার সংকট।
২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় নিহত হন ইরানের দীর্ঘদিনের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে ৩৭ বছর ধরে চলে আসা এক নেতৃত্বের অবসান ঘটে। কিন্তু যুদ্ধের মধ্যেই ইরানের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়—কে হবেন পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা?
মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই সেই প্রশ্নের উত্তর আসে। ৮ মার্চ ইরানের অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস বা বিশেষজ্ঞ পরিষদ মোজতবা খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত করে। ৫৬ বছর বয়সী মোজতবা হলেন আলী খামেনির দ্বিতীয় পুত্র এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর তৃতীয় সর্বোচ্চ নেতা।
কিন্তু তাঁর ক্ষমতার শীর্ষে ওঠার গল্পটি শুধু একটি রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে যুদ্ধ, গোপন আলোচনা, নিরাপত্তা, পারিবারিক উত্তরাধিকার নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক এবং ইরানের সবচেয়ে কঠিন সময়ে ক্ষমতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার চেষ্টা।
আলী খামেনির মৃত্যুর পর ইরানের রাষ্ট্রযন্ত্রকে খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কারণ সর্বোচ্চ নেতা শুধু ধর্মীয় বা প্রতীকী পদ নন; দেশটির সামরিক বাহিনী ও ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোরের সর্বাধিনায়কত্বসহ যুদ্ধ ও শান্তি, পররাষ্ট্রনীতির মৌলিক দিক এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর তাঁর ব্যাপক সাংবিধানিক ক্ষমতা রয়েছে।
যুদ্ধের পরিস্থিতিতে তাই দীর্ঘ সময় নেতৃত্ব শূন্য রাখা ইরানের জন্য বড় ধরনের সাংবিধানিক ও নিরাপত্তাগত সমস্যা তৈরি করতে পারত।
আলী খামেনির মৃত্যুর পরপরই উত্তরসূরি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। ইরানি সংবাদমাধ্যম ও বিভিন্ন বিশ্লেষণে একাধিক নাম সামনে এলেও মোজতবা খামেনির নাম দ্রুত আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। আলী খামেনির ঘনিষ্ঠ বৃত্তে দীর্ঘদিন প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত মোজতবার নাম আগেও সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে আলোচিত হয়েছে।
মোজতবার নির্বাচনকে ঘিরে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি ছিল তাঁর অবস্থান।
আপনার দেওয়া বর্ণনায় বলা হয়েছে, বাবার মৃত্যুর সময় মোজতবা নিজেও হামলায় গুরুতর আহত হন এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। পরবর্তী হামলায় হাসপাতাল ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাঁকে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়।
তবে এই নির্দিষ্ট ঘটনাপ্রবাহের স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি। পরবর্তী মাসগুলোতেও তাঁর জনসমক্ষে উপস্থিতি অত্যন্ত সীমিত ছিল। এমনকি জুলাইয়ে তাঁর বাবা আলী খামেনির শেষকৃত্যেও মোজতবাকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি।
এই অনুপস্থিতি তাঁর নিরাপত্তা, শারীরিক অবস্থা এবং কোথায় অবস্থান করছেন—এসব নিয়ে নানা জল্পনার জন্ম দেয়।
তবে যুদ্ধের সময় তাঁর নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল—এমন ধারণা তৈরি হওয়ার মতো পরিস্থিতি অবশ্যই ছিল। কারণ ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী স্পষ্টভাবে হুমকি দিয়েছিল, আলী খামেনির উত্তরসূরি নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদেরও লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে।
ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের দায়িত্ব ৮৮ সদস্যের বিশেষজ্ঞ পরিষদের। আলী খামেনির মৃত্যুর পর এই পরিষদই নতুন নেতার নাম নির্ধারণ করে।
দেশ তখন সরাসরি যুদ্ধের মধ্যে। তেহরানসহ বিভিন্ন স্থানে হামলা চলছে। যোগাযোগব্যবস্থা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি অনিশ্চিত। এমন অবস্থায় পরিষদের বৈঠক কীভাবে হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
বিশেষজ্ঞ পরিষদের সদস্য মোহসেন হেইদারি আলেকাসির জানান, বর্তমান পরিস্থিতিতে পরিষদের সব সদস্যের স্বাভাবিকভাবে এক জায়গায় বসা কঠিন ছিল। একই সময়ে তিনি বলেন, নেতৃত্ব নির্বাচনের জন্য একটি প্রার্থী নিয়ে ঐকমত্য তৈরি হয়েছিল।
এরপর ৮ মার্চ ঘোষণা আসে—মোজতবা খামেনিই ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা।
আপনার দেওয়া বর্ণনায় বলা হয়েছে, গোপন ভোটে উপস্থিত ৫৯ সদস্যের মধ্যে মোজতবা ৫০ ভোট পান।
কিন্তু প্রকাশ্য ও নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে এই নির্দিষ্ট ভোটসংখ্যার স্বাধীন নিশ্চিতকরণ পাওয়া যাচ্ছে না। তাই প্রকাশিত ফিচারে ৫০ ভোটের তথ্যকে নিশ্চিত ফলাফল হিসেবে ব্যবহার না করাই নিরাপদ।
নিশ্চিত বিষয় হলো, বিশেষজ্ঞ পরিষদ মোজতবা খামেনিকে নির্বাচিত করেছে এবং ৮ মার্চ তাঁর নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়।
মোজতবা খামেনি কোনো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ছিলেন না। তিনি কখনো জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থীও হননি। কিন্তু ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল দীর্ঘদিনের।
বিশেষ করে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোরের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বাবার ঘনিষ্ঠ বৃত্তে থেকেও তিনি পর্দার আড়ালে প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
তাঁর নাম এর আগেও সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে আলোচিত হয়েছে। কিন্তু তাঁর সামনে বড় বাধা ছিল ‘বংশগত উত্তরাধিকার’-এর প্রশ্ন।
কারণ ইসলামি প্রজাতন্ত্রের রাজনৈতিক কাঠামো আনুষ্ঠানিকভাবে রাজতন্ত্র নয়। সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হন বিশেষজ্ঞ পরিষদের মাধ্যমে। ফলে বাবা থেকে ছেলের হাতে সর্বোচ্চ নেতৃত্ব চলে যাওয়া স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি করতে পারে।
মোজতবার ক্ষেত্রে সেই বিতর্ক আরও তীব্র হওয়ার কারণ—তিনি এমন একজন নেতার ছেলে, যিনি প্রায় চার দশক ধরে ইরানের সর্বোচ্চ ক্ষমতায় ছিলেন।
মোজতবার নির্বাচনের সময় ইরান যে পরিস্থিতির মধ্যে ছিল, সেটিই সম্ভবত পুরো প্রক্রিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট।
আলী খামেনির মৃত্যুর পর দেশটির সামনে ছিল একই সঙ্গে যুদ্ধ পরিচালনা, সামরিক কমান্ড বজায় রাখা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সচল রাখা এবং জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক স্থিতি ধরে রাখার প্রশ্ন।
এই পরিস্থিতিতে দীর্ঘ রাজনৈতিক দর-কষাকষির পরিবর্তে দ্রুত একজন গ্রহণযোগ্য উত্তরসূরি নির্বাচন করা ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণেও মোজতবার নির্বাচনের মধ্যে ধারাবাহিকতার বার্তা দেখা হয়েছে। আল জাজিরার বিশ্লেষণে তাঁর নির্বাচনকে ইরানের বিদ্যমান ক্ষমতার কাঠামোর ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হয়েছে।
মোজতবার নাম সামনে আসার আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, ওয়াশিংটনের অনুমোদন ছাড়া ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে পারবেন না—এমন বক্তব্যও তিনি দেন।
ইরান অবশ্য এমন অবস্থান প্রত্যাখ্যান করে। দেশটির কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেন, ইরানের নেতৃত্ব কে দেবেন, সেই সিদ্ধান্ত ইরানিরাই নেবে।
এরপর মোজতবা নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে তেহরান কার্যত দেখিয়ে দেয়—যুদ্ধের মধ্যেও নেতৃত্ব নির্বাচনের সিদ্ধান্ত বাইরের চাপের ভিত্তিতে নেওয়া হবে না।
মোজতবার সামনে এখন সবচেয়ে কঠিন কাজ—শুধু বাবার উত্তরসূরি হিসেবে পরিচিত না হয়ে নিজের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা।
আলী খামেনি প্রায় ৩৭ বছর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা ছিলেন। তাঁর সময়ে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক, ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাত, পরমাণু কর্মসূচি, আঞ্চলিক মিত্রগোষ্ঠী এবং বিপ্লবী গার্ডের ভূমিকা—সবই রাষ্ট্রীয় নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছিল।
মোজতবা সেই কাঠামোর মধ্য থেকেই উঠে এসেছেন।
তাঁর নির্বাচনের পর ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি, পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ এবং ইসলামি বিপ্লবী গার্ডসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও নেতারা তাঁর প্রতি সমর্থন জানান।
মোজতবা যখন সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব নিলেন, তখন যুদ্ধ থামেনি। বরং তাঁর নেতৃত্বের প্রথম পরীক্ষাই হয়ে দাঁড়ায় যুদ্ধ পরিচালনা এবং একই সঙ্গে কূটনীতির দরজা খোলা রাখা।
তাঁর সামনে রয়েছে আরও কয়েকটি বড় প্রশ্ন—যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক কোন পথে যাবে, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানের অবস্থান কতটা বদলাবে, পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ভবিষ্যৎ কী হবে এবং বিপ্লবী গার্ডের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সমন্বয় কীভাবে পরিচালিত হবে।
তাঁর নির্বাচনের পর আল জাজিরার বিশ্লেষণে ইরানের নীতিতে ধারাবাহিকতার সম্ভাবনার কথা বলা হলেও একই সঙ্গে আলোচনার পথ কতটা খোলা থাকবে, সেটি অনিশ্চিত বলে উল্লেখ করা হয়।
মোজতবা খামেনির উত্থানের গল্প তাই শুধু একজন ব্যক্তির ক্ষমতায় আসার গল্প নয়। এটি যুদ্ধের মধ্যে একটি রাষ্ট্র কীভাবে তার সর্বোচ্চ নেতৃত্ব পুনর্গঠন করে, তারও গল্প।
বাবার মৃত্যুর পর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে ইরানকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করতে হয়েছে। সেই নেতা আবার এমন একজন, যাঁকে বহু বছর ধরে ক্ষমতার অন্তরালে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে দেখা হয়েছে।
তাঁর নির্বাচনের পেছনে কতটা পারিবারিক উত্তরাধিকার, কতটা নিরাপত্তা কাঠামোর সমর্থন এবং কতটা যুদ্ধকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতা কাজ করেছে—তার পূর্ণ উত্তর হয়তো সময়ই দেবে।
তবে একটি বিষয় ইতিমধ্যেই স্পষ্ট: আলী খামেনির যুগ শেষ হলেও খামেনি পরিবারের রাজনৈতিক অধ্যায় শেষ হয়নি। বরং যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকেই শুরু হয়েছে মোজতবা খামেনির যুগ।
ইরানের উপর ওয়াশিংটনের নতুন নিষেধাজ্ঞা
যুদ্ধ দীর্ঘ হলেও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যেতে পারবে ইরান
পাকিস্তানের চীনা সামুদ্রিক 'গুপ্তঘাতক', ভারতের জন্য কতটা চিন্তার?
মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর ইরাকের সামনে নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ