ইয়েমেনের হুথি সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলার মুখে সৌদি আরব নিজেদের নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো ছাড় দেবে না বলে জানিয়েছেন দেশটির যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান। তিনি বলেছেন, সৌদি আরবের নিরাপত্তার ওপর যেকোনো হুমকি বা হামলার বিরুদ্ধে ‘দৃঢ়ভাবে’ জবাব দিতে তারা দ্বিধা করবে না।
বুধবার সৌদি বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সৌদের পক্ষে শুরা কাউন্সিলের নবম অধিবেশনের তৃতীয় বছরের উদ্বোধনী অধিবেশনে দেওয়া বার্ষিক ভাষণে এসব কথা বলেন মোহাম্মদ বিন সালমান।
তিনি বলেন, হুথিরা ‘বিশৃঙ্খলা ও ধ্বংস’কে নিজেদের পথ হিসেবে বেছে নিয়েছে এবং এর মাধ্যমে ইয়েমেনের জনগণ ও পুরো অঞ্চলকে হুমকির মুখে ফেলছে। তবে উত্তেজনা কমানো এবং কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজতে সৌদি আরব সম্ভাব্য সব প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলেও জানান তিনি। একই সঙ্গে নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোনো আপস করা হবে না বলে স্পষ্ট করেন সৌদি যুবরাজ।
মোহাম্মদ বিন সালমান বলেন, ‘আমাদের নিরাপত্তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে যেকোনো হুমকি বা হামলার জবাব দৃঢ়ভাবে দিতে আমরা দ্বিধা করব না।’
তিনি আরও বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর সাম্প্রতিক হামলাগুলো প্রমাণ করেছে যে উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। সৌদি আরব উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) দেশগুলোর সঙ্গে নিরাপত্তা রক্ষায় সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে বলেও জানান তিনি।
তুরস্ক-পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা জোট
ভাষণে আগস্টে আনুষ্ঠানিক হওয়া সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের ত্রিপক্ষীয় মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির কথাও তুলে ধরেন সৌদি যুবরাজ। তার মতে, এই জোট আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা জোরদার, সংঘাত ও উত্তেজনার প্রভাব থেকে অঞ্চলকে সুরক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর উদ্যোগের অংশ।
এরই মধ্যে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মুহাম্মদ আসিফ জানিয়েছেন, হুথিদের হামলা অব্যাহত থাকলে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় সৌদি আরবকে ‘যেকোনো উপায়ে’ সহযোগিতা করবে ইসলামাবাদ। তবে সৌদি আরব পাকিস্তানের কাছে সামরিক সহায়তা চেয়েছে কি না, তা স্পষ্ট করেননি তিনি।
লোহিত সাগরে বহুজাতিক নৌজোট
লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাব প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়েও কথা বলেন মোহাম্মদ বিন সালমান। আন্তর্জাতিক জলপথকে রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের বিরোধিতা করেন তিনি।
সৌদি যুবরাজ জানান, আন্তর্জাতিক জলপথে অভিন্ন স্বার্থ ও নৌ-নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি ‘বহুজাতিক প্রতিরক্ষামূলক সামুদ্রিক জোট’ গঠন করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে উত্তেজনা বেড়েছে। গত সপ্তাহে রিয়াদ দাবি করে, পশ্চিম সৌদির তাইফ ও লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরমুখী ছয়টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তারা প্রতিহত করেছে। অন্যদিকে হুথিরা সৌদি রাজধানী রিয়াদে একটি ‘সংবেদনশীল লক্ষ্যবস্তু’ এবং ইয়ানবুতে সৌদি আরামকোর স্থাপনায় হামলার দাবি করেছে।
এর আগে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছিল, হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় খামিস মুশাইত, আবহা ও তাইফে ১৩ জন বেসামরিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন।
এদিকে ইয়েমেনের সংঘাত নতুন করে তীব্র হওয়ার মধ্যে জাতিসংঘের বিশেষ দূত হ্যান্স গ্রুন্ডবার্গও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছেন। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি হুথি প্রতিনিধিদের সঙ্গে ওমানের মাসকাটে এবং সৌদি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
সৌদি যুবরাজের বক্তব্যে একদিকে হুথিদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিক্রিয়ার বার্তা, অন্যদিকে উত্তেজনা কমানো ও কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান দুই দিকই উঠে এসেছে। এর ফলে ইয়েমেনের সংঘাত ও লোহিত সাগরের নৌ-নিরাপত্তা ঘিরে আঞ্চলিক কূটনৈতিক ও সামরিক তৎপরতা আরও বাড়তে পারে।