সৌদির লোহিত সাগর উপকূলে ফের শুরু হলো তেল লোডিং

আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:২৭ এএম

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের মধ্যে হরমুজ প্রণালির বিকল্প রুট হিসেবে সৌদি আরবের লোহিত সাগর উপকূল দিয়ে আবারও তেল রপ্তানি জোরদার হচ্ছে। দেশটির ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনে কার্যক্রম পুনরায় শুরু হওয়ার পর লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানি ট্যাংকারে তোলার কাজ শুরু হয়েছে। জাহাজ চলাচল ও বাণিজ্যিক সূত্রের তথ্যের পাশাপাশি স্যাটেলাইট চিত্রেও এই কার্যক্রমের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরব ১১ সেপ্টেম্বর ড্রোন হামলার পর ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছিল। এর ফলে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর থেকে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। ২২ সেপ্টেম্বর পাইপলাইনে আবার তেল প্রবাহ শুরু হয় এবং এর পরপরই ইয়ানবু থেকে তেল লোডিং পুনরায় চালু হয়েছে।

সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকো ২৮ সেপ্টেম্বর গ্রাহকদের অক্টোবর মাসের ইয়ানবু লোডিং সূচি জানিয়েছে। বাণিজ্যিক সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, গত সপ্তাহের শেষ দিকে ইয়ানবু থেকে একটি চালানও তোলা হয়েছে।

তেল সরবরাহ পরিস্থিতির পরিবর্তন শুধু বাণিজ্যিক সূত্রেই নয়, স্যাটেলাইট চিত্রেও ধরা পড়েছে। জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ট্যাংকারট্র্যাকার্স ডটকম জানিয়েছে, ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার ২৭ সেপ্টেম্বরের স্যাটেলাইট চিত্রে ইয়ানবু ও এর দক্ষিণে অবস্থিত আল-মুয়াজ্জিজ টার্মিনালে প্রায় ১০ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল লোড হতে দেখা গেছে।

একই চিত্রে পরিশোধিত জ্বালানি তোলার কার্যক্রমও দেখা গেছে। ওই দুটি টার্মিনালের আশপাশে মোট ৪০টি ট্যাংকার শনাক্ত করা হয়েছে। তবে এসব জাহাজের সবগুলো যে একই সময়ে তেল লোড করছিল, এমন দাবি করা হয়নি।

বাণিজ্যিক সূত্রগুলো ইয়ানবু থেকে গত সপ্তাহে প্রতিদিন প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল লোড হওয়ার হিসাব দিয়েছে। অন্যদিকে জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের হিসাবে, বর্তমানে ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে প্রতিদিন প্রায় ২৬ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল তেল প্রবাহিত হচ্ছে। আগামী কয়েক দিনে তা ৩০ থেকে ৪০ লাখ ব্যারেলে উন্নীত হতে পারে।

ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের মোট পরিবহন সক্ষমতা প্রতিদিন প্রায় ৭০ লাখ ব্যারেল। তবে বর্তমানে এর চেয়ে অনেক কম পরিমাণে তেল প্রবাহিত হচ্ছে। কেপলারের হিসাবে, হামলার আগের দৈনিক প্রায় ৫৫ লাখ ব্যারেল প্রবাহের পর্যায়ে ফিরতে আরও প্রায় এক মাস সময় লাগতে পারে।

অর্থাৎ ইয়ানবু বন্দরে তেল লোডিং শুরু হওয়া সৌদি আরবের রপ্তানি অবকাঠামো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে যাওয়ার অর্থ নয়। বরং এটি পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

ইয়ানবু টার্মিনালে ২২ সেপ্টেম্বর প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের মজুত বেড়েছিল। হামলার পর এটি ছিল প্রথম উল্লেখযোগ্য মজুত বৃদ্ধি বলে কেপলারের তথ্য জানিয়েছে।

সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন দেশটির পূর্বাঞ্চলের তেল উৎপাদন অঞ্চলকে পশ্চিম উপকূলের ইয়ানবু বন্দরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। ফলে পারস্য উপসাগর থেকে জাহাজে করে হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার পরিবর্তে স্থলপথে তেল পরিবহন করে লোহিত সাগরের ইয়ানবু থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানো সম্ভব।

বর্তমান আঞ্চলিক সংঘাতে এই অবকাঠামোর গুরুত্ব আরও বেড়েছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য বিকল্প রপ্তানি পথ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

রয়টার্সের হিসাবে, সেপ্টেম্বরের ২২ তারিখ পর্যন্ত সাত দিনের গড় হিসাবে হরমুজ প্রণালিতে অপরিশোধিত তেল পরিবহন—ওমান উপসাগরে জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তরসহ প্রতিদিন প্রায় ৯০ লাখ ব্যারেলে উঠেছে। জুলাইয়ের শেষ দিকে এই পরিমাণ ছিল মাত্র ২২ লাখ ব্যারেল। তবে এই প্রবাহ এখনো ২০২৫ সালের গড়ের প্রায় ৬০ শতাংশ।

ইয়ানবুতে তেল লোডিং পুনরায় শুরু হওয়া একক কোনো ঘটনা নয়। মিসরের ভূমধ্যসাগরীয় সিদি কেরির টার্মিনালেও ২২ সেপ্টেম্বর ১০ দিনের বিরতির পর অপরিশোধিত তেল লোডিং পুনরায় শুরু হয়েছে। তবে সেখানে এখনো কিছু ট্যাংকার সমুদ্রে অপেক্ষমাণ রয়েছে এবং বাণিজ্যিক জাহাজের প্রবেশে বিধিনিষেধ রয়েছে বলে কেপলার জানিয়েছে।

কেপলারের হিসাব অনুযায়ী, ইয়ানবু ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ দিয়ে বাড়তি তেল সরবরাহ যুক্ত হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের অপরিশোধিত তেল রপ্তানি সংঘাত-পূর্ব মাত্রার প্রায় ৮০ শতাংশের কাছাকাছি উঠেছে। এর ফলে সাম্প্রতিক সরবরাহ সংকট কিছুটা প্রশমিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

তবে সরবরাহব্যবস্থার এই পুনরুদ্ধার এখনো ঝুঁকিমুক্ত নয়। হরমুজ প্রণালি, বাব আল-মান্দেব ও লোহিত সাগর, এই তিন গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক তেলবাজারের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।

সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দরে তেল লোডিং পুনরায় শুরু হলেও লোহিত সাগরের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে। এর আগে ইয়েমেনের হুথিদের হামলার কারণে বাব আল-মান্দেব ও লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল কমে গিয়েছিল। জুলাইয়ে রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, এক পর্যায়ে বাব আল-মান্দেব দিয়ে দৈনিক মাত্র ১১টি পণ্যবাহী জাহাজ পার হয়েছিল, যা কয়েক মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন ছিল।

এ পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের জন্য ইয়ানবু রুট যেমন হরমুজের ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি করছে, তেমনি লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেবের নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

ইয়ানবুতে তেল লোডিং পুনরায় শুরু হওয়ার খবর আন্তর্জাতিক বাজারে ইতোমধ্যে প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। রয়টার্স জানিয়েছে, সৌদি পাইপলাইন চালু এবং ইয়ানবু থেকে রপ্তানি ফেরার খবরের পর বৈশ্বিক তেলের দামে চাপ তৈরি হয়েছে।

৩০ সেপ্টেম্বরের বাজার বিশ্লেষণেও দেখা গেছে, সৌদি আরবের সেপ্টেম্বরের অপরিশোধিত তেল রপ্তানি দৈনিক প্রায় ৫৮ লাখ ব্যারেলে উঠতে পারে, যা ফেব্রুয়ারির পর সর্বোচ্চ বলে এএনজেড রিসার্চের উদ্ধৃতি দিয়ে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে। একই সময়ে ইয়ানবু বন্দরে ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল লোডিং পুনরায় শুরু হওয়াকে সরবরাহ বাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে বাজারে তেলের দাম শেষ পর্যন্ত কোন দিকে যাবে, তা শুধু সৌদি রপ্তানির ওপর নির্ভর করছে না। হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা, মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক পরিস্থিতি, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক এবং অন্যান্য উৎপাদক দেশের সরবরাহ—সবকিছু মিলিয়েই আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি নির্ধারিত হবে।

ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন পুনরায় চালু এবং ইয়ানবুতে তেল লোডিং শুরু সৌদি আরবের জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্বস্তির খবর হলেও পুরো সরবরাহব্যবস্থা এখনো স্বাভাবিক হয়নি। পাইপলাইনের প্রবাহকে হামলার আগের মাত্রায় ফিরিয়ে নেওয়া, লোহিত সাগরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে নিয়মিত চালান বজায় রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হরমুজ প্রণালির বিকল্প হিসেবে ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন সৌদি আরবকে একটি কৌশলগত সুবিধা দিচ্ছে। কিন্তু পাইপলাইনের সক্ষমতা, ইয়ানবু বন্দরের লোডিং ক্ষমতা এবং লোহিত সাগরের নিরাপত্তা, এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে কার্যকর না থাকলে বিকল্প রুটটি পূর্ণ সক্ষমতায় ব্যবহার করা কঠিন হবে।

ফলে ইয়ানবুতে আবার তেল লোডিং শুরু হওয়াকে শুধু সৌদি আরবের একটি বন্দর কার্যক্রম পুনরায় চালুর ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। হরমুজকেন্দ্রিক সরবরাহঝুঁকির মধ্যে এটি মধ্যপ্রাচ্যের তেল রপ্তানি ব্যবস্থায় বিকল্প পথ সচল রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে এই পথ কতটা নির্ভরযোগ্যভাবে এবং কত দ্রুত পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরতে পারে, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

ওয়াইএ
আরও পড়ুন