কোনো হুমকির মুখেই ইরানের জনগণ আত্মসমর্পণ করবে না: ইসলামি

ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় কৌশলগত এমনকি পারমাণবিক অস্ত্র দিয়ে হামলার মার্কিন হুমকির তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন দেশটির আণবিক শক্তি সংস্থার প্রধান মোহাম্মদ ইসলামি। তিনি বলেছেন, কোনো হুমকি কিংবা সামরিক চাপের মুখেই ইরানের জনগণ আত্মসমর্পণ করবে না।

রোববার ‘ইকোসাইড: দ্য সাইলেন্ট ওয়ার ক্রাইম’ শীর্ষক এক সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে এসলামি এসব কথা বলেন। তাঁর দাবি, ইরানের যোদ্ধারা শত্রুপক্ষের হামলার কঠোর জবাব দিয়েছেন। তবে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী ও তাদের প্রতিপক্ষের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এসলামির ভাষ্য, ইসলামের শিক্ষা অনুসরণ করে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী কেবল সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে এবং বেসামরিক মানুষের ওপর প্রতিশোধমূলক হামলা চালানো থেকে বিরত থাকে।

পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে অপপ্রচারের অভিযোগ

ইরানের পারমাণবিক শিল্প সম্পর্কে শত্রুপক্ষের মিথ্যা প্রচার ও অন্যায্য বয়ানের সমালোচনা করে এসলামি বলেন, দেশটির বিরুদ্ধে অপতথ্য ছড়ানোর প্রচারণা অব্যাহত রয়েছে।

তিনি অভিযোগ করেন, অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে দ্বৈতনীতি অনুসরণের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক সংস্থা ও জাতিসংঘ সনদের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করছে। তাঁর মতে, ওয়াশিংটনের এসব আচরণ এখন সবার কাছেই স্পষ্ট।

এসলামি বিশেষভাবে ইরানের সেই পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলার নিন্দা জানান, যেগুলো আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সুরক্ষা ও তদারকি ব্যবস্থার আওতায় পরিচালিত হয়।

এসব স্থাপনায় হামলার ঘটনায় আন্তর্জাতিক সংস্থাটির নিন্দা না জানানোর বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

এসলামি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় এমন বৈপরীত্য আর কোথায় দেখা যায়?’

তাঁর অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে এমন পারমাণবিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, যেগুলো ধ্বংস হলে মানুষ ও পরিবেশের ওপর ভয়াবহ প্রভাব পড়তে পারে। অথচ সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থাটি এ বিষয়ে নীরব রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

শোধনাগার ও বিকিরণকেন্দ্রেও হামলার অভিযোগ

এসলামির দাবি, সাম্প্রতিক হামলাগুলো শুধু ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তেল শোধনাগার, পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্স এবং ইরানের আণবিক শক্তি সংস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিকিরণকেন্দ্রের মতো অ-পারমাণবিক স্থাপনাও হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।

তিনি বলেন, এসব প্রতিষ্ঠান স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্যনিরাপত্তা এবং জনসাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

এসলামির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বিভিন্ন পরিমাপ, নিরাপত্তা প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ এবং উৎপাদন পর্যবেক্ষণে তেজস্ক্রিয় উৎস ব্যবহার করা হয়। এ ধরনের কেন্দ্রগুলোতে হামলা চালানো মানুষের জীবন, পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকারের প্রতি হামলাকারীদের অবজ্ঞার পরিচয় দেয়।

পারমাণবিক স্থাপনা ও তেজস্ক্রিয় পদার্থ ব্যবহৃত কেন্দ্রগুলোতে হামলার ফলে সম্ভাব্য পরিবেশগত ক্ষতির বিষয়টিও তিনি তুলে ধরেন।

পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের হুমকি নিয়ে উদ্বেগ

ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় কৌশলগত অস্ত্র, এমনকি পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়ে মার্কিন কর্মকর্তাদের বারবার দেওয়া হুমকিরও নিন্দা জানান এসলামি।

তিনি বলেন, জাতিসংঘের মঞ্চ থেকেও এ ধরনের হুমকি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের ইরানের সভ্যতা ধ্বংস করার বিষয়ে করা মন্তব্যের প্রসঙ্গও উল্লেখ করেন তিনি।

এসলামি জোর দিয়ে বলেন, ‘তাদের জানতে হবে, ইরানের জনগণ কখনোই আত্মসমর্পণ করবে না।’

আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্ন

ইরানের আণবিক শক্তি সংস্থার প্রধানের বক্তব্যে পারমাণবিক স্থাপনার নিরাপত্তা, সম্ভাব্য পরিবেশগত বিপর্যয় এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

পারমাণবিক স্থাপনায় সশস্ত্র হামলার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন, বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা এবং পরিবেশগত ঝুঁকির বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ। তবে নির্দিষ্ট কোনো হামলা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে কি না, তা নির্ধারণের জন্য হামলার লক্ষ্য, পরিস্থিতি, সম্ভাব্য সামরিক সুবিধা এবং বেসামরিক ক্ষতির ঝুঁকিসহ প্রাসঙ্গিক তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।

এসলামির বক্তব্য ইরানের সরকারি অবস্থান তুলে ধরে। তাঁর উত্থাপিত হামলার অভিযোগ, পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের হুমকি এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য বিবেচনা করা জরুরি।