ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান দেশটির ঘোষিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলা ইসরায়েলের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা উন্মোচন করেছে বলে দাবি করেছেন ফিলিস্তিনি ইসলামিক জিহাদ (পিআইজে) আন্দোলনের তেহরান প্রতিনিধি নাসের আবু শরিফ। তার মতে, ইসরায়েলকে সামরিক, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সহায়তা দিয়েও যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলো প্রতিরোধ আন্দোলনগুলোকে পরাজিত করতে পারেনি।
ইরানের সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ এজেন্সিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আবু শরিফ বলেন, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলা ইসরায়েলের জন্য বড় ধরনের আকস্মিক ঘটনা ছিল। ফিলিস্তিনি প্রতিরোধযোদ্ধারা দীর্ঘ প্রস্তুতি ও পেশাদারত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন, যার ফলে ইসরায়েলি বাহিনী পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খায় বলে দাবি করেন তিনি। আবু শরিফের ভাষ্য, নজরদারি ক্যামেরা, আকাশপথে পর্যবেক্ষণ এবং যোগাযোগব্যবস্থায় আড়িপাতাসহ ইসরায়েলের বিস্তৃত গোয়েন্দা ও নিরাপত্তাব্যবস্থা হামলা ঠেকাতে পারেনি। গাজার কাছাকাছি ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটিতে প্রতিরোধযোদ্ধাদের পৌঁছে যাওয়ার ঘটনা দেশটির নিরাপত্তা কৌশলের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
৭ অক্টোবরের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ইসরায়েলকে ব্যাপক রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও আর্থিক সহায়তা দিলেও পরবর্তী সামরিক অভিযানগুলোর মাধ্যমে তেল-আবিব তার লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি বলে দাবি করেন পিআইজে প্রতিনিধি। গাজা, পশ্চিম তীর, লেবানন এবং অন্যান্য রণাঙ্গনে পরিচালিত অভিযানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এসব সামরিক তৎপরতা প্রতিরোধ আন্দোলনগুলোকে নির্মূল করতে পারেনি। বরং বেসামরিক মানুষের দুর্ভোগ ও ধ্বংসযজ্ঞ ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির ক্ষতি করেছে বলে তার অভিযোগ।
আবু শরিফ বলেন, এসব কর্মকাণ্ড আরব ও ফিলিস্তিনি সমাজের পাশাপাশি যেসব দেশ ও সমাজ আগে ইসরায়েলকে সুরক্ষা দিয়েছে, সেখানেও দেশটির ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তার অভিযোগ, ৭ অক্টোবরের হামলা এবং পরবর্তী ঘটনাবলির দায় এড়িয়ে যাচ্ছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যেও গাজায় প্রতিরোধ অব্যাহত থাকার দাবি
পিআইজে প্রতিনিধি বলেন, প্রতিরোধ শুধু সশস্ত্র লড়াইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর মধ্যে রাজনৈতিক অবস্থান, দৃঢ়তা এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে টিকে থাকাও অন্তর্ভুক্ত। তার ভাষায়, ‘ধৈর্য ও অবিচলতা আমাদের সংস্কৃতিতে কেবল নৈতিক মূল্যবোধ নয়, বরং কৌশলগত উপাদান।’
গাজার ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের কথা উল্লেখ করে আবু শরিফ দাবি করেন, ইসরায়েলি বাহিনী ভূখণ্ডটির প্রায় ৯০ শতাংশ ধ্বংস করেছে। কিন্তু এত বিপুল ক্ষয়ক্ষতির পরও গাজার জনগণকে সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়া কিংবা পুরো ভূখণ্ডের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘গাজা এখনো অবিচল, এর মানুষ দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে আছে এবং প্রতিরোধ তাদের পক্ষে কথা বলছে।’
হামাসের সঙ্গে তাদের পরামর্শ ও যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান আবু শরিফ। লেবাননে হিজবুল্লাহর ওপর ব্যাপক হামলার পরও সংগঠনটি ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে হাজার হাজার অভিযান চালিয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তার বক্তব্য, প্রতিরোধের মুখে না পড়ে এবং জনবল ও সামরিক সরঞ্জামের ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই লেবাননের ভূখণ্ডের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি ইসরায়েল। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘প্রতিরোধ এখনো জীবিত ও সক্রিয়।’
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে ইসরায়েলের ভাবমূর্তি ক্ষয়ের দাবি
আবু শরিফের মতে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে, ইসরায়েলের অবস্থান দুর্বল হয়েছে। জনমত জরিপ ও পরিসংখ্যানেও এই পরিবর্তনের প্রতিফলন রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তার ধারণা, জনমতের এই পরিবর্তন ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান- কংগ্রেস, সিনেট এবং অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় পর্যায়ের সরকারগুলোর মধ্যেও প্রভাব ফেলতে পারে।
তিনি আরও দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও ইসরায়েলের প্রভাব কমে যাওয়ার বিষয়টি ক্রমেই আলোচনায় আসছে। তার মতে, ইসরায়েল সামরিক ও রাজনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়লেও বিশ্বজুড়ে জায়নবাদবিরোধী মানুষের মধ্যে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের প্রতি সমর্থন বেড়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে জনমতের পরিবর্তন একরকম নয়। বিভিন্ন জরিপে মতামতের পার্থক্য মূল্যায়ন করতে হলে জরিপের সময়কাল, নমুনা, প্রশ্নের ধরন এবং সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠী বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
আরব দেশগুলোর নিরাপত্তা নির্ভরতা নিয়ে প্রশ্ন
মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে আবু শরিফ বলেন, কিছু আরব সরকার এখনো পশ্চিমা শক্তিগুলোর ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল এবং বিশেষ করে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে প্রবল চাপের মুখে রয়েছে। তার দাবি, আরব দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের প্রধান উদ্দেশ্য স্বাগতিক দেশগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নয়, বরং ইসরায়েলকে সুরক্ষা দেওয়া। আঞ্চলিক সংঘাতের পরিস্থিতিতে এসব ঘাঁটি স্বাগতিক দেশগুলোর জন্য বোঝা এবং সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আবু শরিফ বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সুরক্ষা ছাতা কার্যকর প্রমাণিত হয়নি।’ ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানসহ সাম্প্রতিক ঘটনাবলি ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা নিশ্চয়তার সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করেছে বলে দাবি করেন তিনি। তার মতে, আঞ্চলিক দেশগুলোর উচিত নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিকল্প অংশীদারত্ব গড়ে তোলা এবং একটি মাত্র শক্তির ওপর নির্ভরতা কমানো।
আবু শরিফ সৌদি আরবের সঙ্গে চীন, পাকিস্তান ও তুরস্কের ক্রমবর্ধমান যোগাযোগ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক সম্প্রসারণের উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেন। তার মতে, এসব পদক্ষেপ আঞ্চলিক দেশগুলোর আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব বৈচিত্র্যময় করার প্রচেষ্টার ইঙ্গিত দেয়। তবে এসব দেশের পররাষ্ট্রনীতি ও নিরাপত্তা সম্পর্ককে শুধু যুক্তরাষ্ট্র থেকে দূরে সরে যাওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে ব্যাখ্যা করা যথেষ্ট নয়। অর্থনৈতিক সহযোগিতা, প্রতিরক্ষা চুক্তি, জ্বালানি বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক কূটনীতির মতো একাধিক বিষয় এসব সম্পর্ককে প্রভাবিত করে।
সামগ্রিকভাবে, পিআইজে প্রতিনিধির বক্তব্যে তিনটি বিষয় বিশেষভাবে উঠে এসেছে- ইসরায়েলের নিরাপত্তা কৌশল নিয়ে প্রশ্ন, ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের টিকে থাকার দাবি এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ভূমিকা নিয়ে সংশয়। তবে এগুলো মূলত একটি ফিলিস্তিনি সশস্ত্র রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রতিনিধির মূল্যায়ন। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য, স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য এবং নির্ভরযোগ্য জনমত জরিপের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলেই আঞ্চলিক পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও পূর্ণাঙ্গ ধারণা পাওয়া সম্ভব।
মার্কিন নিরাপত্তা ছাতা থেকে বেরিয়ে আসুন: আবোলফজল শেখারচি
'ওয়াশিংটন চায় না মুসলিম বিশ্ব আরও শক্তিশালী হোক'
সৌদিতে বাংলাদেশিদের সতর্ক থাকার আহ্বান
ভারতে উচ্চস্বরে আজান দেওয়ায় মুয়াজ্জিন গ্রেপ্তার, মাইক জব্দ
প্রতিবেশীদের সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক চায় ইরান: গারিবাবাদি