মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান সংঘাতের মধ্যে নতুন করে আলোচনায় এসেছে ইয়েমেনের হুথি আন্দোলন। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত কিং খালিদ বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি করেছে গোষ্ঠীটি। অন্যদিকে, সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের দাবি, রিয়াদ অভিমুখে ছোড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে।
হুথিদের হামলা এবং সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হচ্ছে, ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের এই সংঘাত কেবল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ইরান-সৌদি প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত, লোহিত সাগরের নৌপথ এবং বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তা।
কিন্তু কারা এই হুথি? কেন তারা সৌদি আরবকে লক্ষ্যবস্তু করছে? আর সামরিক শক্তি ও প্রযুক্তিতে অনেক এগিয়ে থাকা সৌদি আরবের জন্য তাদের মোকাবিলা করা এত কঠিন কেন?
হুথি আন্দোলনের জন্ম যেভাবে
হুথিদের আনুষ্ঠানিক নাম ‘আনসার আল্লাহ’, যার অর্থ ‘আল্লাহর সাহায্যকারী’ বা ‘আল্লাহর সমর্থক’। ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলে ১৯৯০-এর দশকে আন্দোলনটির উত্থান ঘটে। এটি শিয়া ইসলামের জায়দি সম্প্রদায়ভিত্তিক একটি রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সামরিক আন্দোলন।
জায়দিরা ইয়েমেনের ইতিহাসে দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ভূমিকা পালন করেছে। উত্তর ইয়েমেনের কিছু অঞ্চলে জায়দি ইমামদের শাসন ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের বহু এলাকা অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়ে এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ বণ্টনে বঞ্চনার অভিযোগ জোরালো হয়। এই পরিস্থিতিতে জায়দি ধর্মীয় পরিচয় ও স্থানীয় অধিকারকে কেন্দ্র করে হুথি আন্দোলন গড়ে ওঠে।
আন্দোলনটির নাম এসেছে এর প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন বদরুদ্দিন আল-হুথির নাম থেকে। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর ভাই আবদুল মালিক আল-হুথি আন্দোলনের প্রধান নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন।
প্রথম দিকে ধর্মীয় ও সামাজিক পুনর্জাগরণমূলক আন্দোলন হিসেবে পরিচিত হলেও পরবর্তী সময়ে এটি ইয়েমেনের কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে সংগঠনটি একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তিতে পরিণত হয়।
রাজধানী সানা দখল ও ক্ষমতার বিস্তার
২০১১ সালে আরব বসন্তের গণবিক্ষোভের ধারাবাহিকতায় ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহ ক্ষমতা ছাড়েন। এরপর দেশটিতে রাজনৈতিক রূপান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হলেও ক্ষমতা ভাগাভাগি, নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ অব্যাহত থাকে।
এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে হুথিরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে থাকে। ২০১৪ সালে তারা রাজধানী সানা দখল করে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার রাজধানী থেকে সরে যেতে বাধ্য হয় এবং পরবর্তী সময়ে ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চল, বিশেষত এডেনকে কেন্দ্র করে নিজেদের অবস্থান পুনর্গঠনের চেষ্টা করে।
২০১৫ সালে সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি সামরিক জোট ইয়েমেনে হস্তক্ষেপ করে। তাদের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল হুথিদের অগ্রযাত্রা থামানো, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে পুনর্বহাল করা এবং রাজনৈতিক রূপান্তরের পথ পুনরুদ্ধার করা।
কিন্তু দীর্ঘ সামরিক অভিযানেও হুথিদের উত্তর-পশ্চিম ইয়েমেনের প্রধান ঘাঁটি থেকে উৎখাত করা যায়নি। বরং যুদ্ধের ফলে দেশটির অবকাঠামো ধ্বংস, খাদ্যসংকট, বাস্তুচ্যুতি এবং স্বাস্থ্যসেবার বিপর্যয় আরও গভীর হয়।
সৌদি আরবের সঙ্গে শত্রুতার মূল কারণ কী?
সৌদি আরব ও হুথিদের সংঘাতের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সীমান্ত নিরাপত্তা, ইয়েমেনের ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ এবং ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা।
প্রথমত, সীমান্ত নিরাপত্তা। ইয়েমেনের সঙ্গে সৌদি আরবের দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। সেখানে সৌদি আরবের বিরোধী একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী শক্তিশালী অবস্থানে থাকলে রিয়াদের নিরাপত্তা পরিকল্পনায় সরাসরি প্রভাব পড়ে। হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা এই উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
দ্বিতীয়ত, আঞ্চলিক প্রভাবের প্রতিযোগিতা। সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে ইয়েমেনের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় প্রভাব বজায় রাখতে চেয়েছে। অন্যদিকে, হুথিরা সৌদি-সমর্থিত রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রত্যাখ্যান করে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। ফলে ইয়েমেনের সংঘাত বৃহত্তর সৌদি-ইরান প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ হয়ে উঠেছে।
তৃতীয়ত, সামরিক অভিযানের প্রতিক্রিয়া। হুথিদের দৃষ্টিতে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক হস্তক্ষেপ তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। তাই সৌদি ভূখণ্ডে হামলাকে তারা প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং নিজেদের সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শনের কৌশল হিসেবে ব্যবহার করে।
তবে হুথিদের সব কর্মকাণ্ডকে কেবল ইরানের নির্দেশের ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা যথাযথ নয়। তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক লক্ষ্য, ইয়েমেনের ক্ষমতার লড়াই এবং স্থানীয় সামাজিক-ঐতিহাসিক বাস্তবতাও গুরুত্বপূর্ণ।
ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক কতটা গভীর?
ইরান হুথিদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমর্থক। তেহরান তাদের বৃহত্তর ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ বা প্রতিরোধ অক্ষের অংশ হিসেবে দেখে। এই আঞ্চলিক বলয়ে লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইরাকের কয়েকটি ইরান-ঘনিষ্ঠ সশস্ত্র গোষ্ঠীও রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশের অভিযোগ, ইরান হুথিদের অস্ত্র, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও আর্থিক সহায়তা দিয়েছে। হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ইরানি প্রযুক্তি ও নকশার প্রভাব রয়েছে বলেও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে হুথিরা নিজেদের ইরানের সরাসরি নিয়ন্ত্রণাধীন গোষ্ঠী হিসেবে পরিচয় দিতে অস্বীকৃতি জানায়। তাদের বক্তব্য, ইয়েমেনের নিজস্ব পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক লক্ষ্য থেকেই তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। ইরানের সঙ্গে হুথিদের রাজনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হলেও, দুই পক্ষের সব সিদ্ধান্ত একই কেন্দ্র থেকে পরিচালিত হয়—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য পৃথক প্রমাণ প্রয়োজন। হুথিদের নিজস্ব নেতৃত্ব ও স্থানীয় স্বার্থকে বিবেচনায় না নিলে ইয়েমেনের সংঘাতের প্রকৃত চিত্র অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষার জন্য চ্যালেঞ্জ কেন?
সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রতিরক্ষা ব্যয়কারী দেশ। দেশটির কাছে উন্নত যুদ্ধবিমান, রাডার, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থা এবং আকাশ প্রতিরক্ষার বিভিন্ন স্তর রয়েছে। তারপরও হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ঠেকানো কঠিন হয়ে উঠেছে।
এর একটি কারণ হলো, প্রতিপক্ষের অস্ত্রের তুলনামূলক কম দাম এবং আক্রমণ প্রতিহত করার ব্যয়ের মধ্যে বড় ব্যবধান। একটি ব্যয়বহুল প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে তুলনামূলক সস্তা ড্রোন ধ্বংস করতে হলে দীর্ঘমেয়াদে প্রতিরক্ষার খরচ বেড়ে যায়।
দ্বিতীয়ত, একাধিক দিক থেকে বিভিন্ন গতির ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন একসঙ্গে ছোড়া হলে প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি হয়। সব লক্ষ্য শনাক্ত করা, কোনটি আগে প্রতিহত করতে হবে তা নির্ধারণ করা এবং দ্রুত পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া—প্রতিটি ধাপেই সময় গুরুত্বপূর্ণ।
তৃতীয়ত, ইয়েমেনের ভূপ্রকৃতি হুথিদের জন্য সুবিধাজনক। পাহাড়ি অঞ্চল, দুর্গম উপত্যকা ও বিস্তৃত মরুভূমিতে তাদের অবস্থান শনাক্ত করা এবং সামরিক অভিযান চালানো কঠিন। বিমান হামলায় কিছু স্থাপনা ধ্বংস করা সম্ভব হলেও তাতে পুরো সংগঠনকে নিশ্চিহ্ন করা যায় না।
চতুর্থত, হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন কর্মসূচি সময়ের সঙ্গে বিকশিত হয়েছে। তারা স্বল্পপাল্লার অস্ত্রের পাশাপাশি দীর্ঘপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও আক্রমণাত্মক ড্রোন ব্যবহারের সক্ষমতা দেখিয়েছে। ফলে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, বিমানবন্দর ও জ্বালানি অবকাঠামো ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
তবে রিয়াদ বিমানবন্দরে সাম্প্রতিক হামলার দাবি এবং সৌদি প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ব্যর্থতা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য প্রয়োজন। হুথিদের দাবি, সৌদি জোটের বক্তব্য এবং প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির হিসাব এক বিষয় নয়।
লোহিত সাগর ও বিশ্ব বাণিজ্যে হুথিদের প্রভাব
হুথিদের প্রভাব শুধু ইয়েমেন বা সৌদি আরবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রবেশপথের কাছে বাব আল-মান্দেব প্রণালির অবস্থান বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রণালি দিয়ে লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের মধ্যে জাহাজ চলাচল করে। সুয়েজ খাল হয়ে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে পণ্য পরিবহনের অন্যতম প্রধান পথ এটি।
২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে হুথিরা লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা শুরু করে। তাদের দাবি ছিল, ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানানো এবং ইসরায়েলের ওপর চাপ সৃষ্টি করাই এসব হামলার উদ্দেশ্য।
কিন্তু হামলার ফলে শুধু ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট জাহাজ নয়, আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থাও ঝুঁকির মুখে পড়ে। নিরাপত্তার কারণে বহু জাহাজকে লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল এড়িয়ে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে চলাচল করতে হয়েছে। এতে যাত্রার সময়, জ্বালানি ব্যয়, বিমা খরচ এবং পণ্য পরিবহনের সামগ্রিক ব্যয় বেড়েছে।
বিশ্বের মোট সামুদ্রিক বাণিজ্যের কত অংশ এই পথ দিয়ে যায়, তা পণ্য, সময়কাল ও হিসাবের পদ্ধতি অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। তবে পথটির গুরুত্ব নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এখানে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা দেখা দিলে জ্বালানি, শিল্পের কাঁচামাল এবং ভোগ্যপণ্যের সরবরাহে প্রভাব পড়তে পারে।
সৌদি আরবের জ্বালানি নিরাপত্তা কেন ঝুঁকিতে?
সৌদি আরব বিশ্বের প্রধান তেল উৎপাদক ও রপ্তানিকারকদের একটি। দেশটির অর্থনীতি, সরকারি আয় এবং আন্তর্জাতিক প্রভাবের বড় অংশ জ্বালানি খাতের সঙ্গে সম্পর্কিত।
পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালি ঘিরে সংঘাত তীব্র হলে সৌদি আরব বিকল্প রপ্তানি পথ ব্যবহারের প্রয়োজন অনুভব করতে পারে। দেশটির লোহিত সাগর উপকূলের ইয়ানবু বন্দর এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি বাব আল-মান্দেব ও লোহিত সাগরও ঝুঁকির মুখে পড়লে বিকল্প পথের কার্যকারিতা সীমিত হয়ে যেতে পারে।
অর্থাৎ, একদিকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়া এবং অন্যদিকে লোহিত সাগরে হুথিদের হামলা—দুটি ঘটনা একসঙ্গে ঘটলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি পরিবহন ও বিমা ব্যয় বৃদ্ধি, সরবরাহে বিলম্ব এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে। তবে এসব প্রভাবের মাত্রা নির্ভর করবে সংঘাতের স্থায়িত্ব, বিকল্প সরবরাহের সক্ষমতা এবং বাজারের প্রতিক্রিয়ার ওপর।
হুথিদের লক্ষ্য কি শুধু সৌদি আরব?
না। হুথিদের সামরিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে একাধিক লক্ষ্য কাজ করে। ইয়েমেনের অভ্যন্তরে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা, প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক শক্তিকে চাপে রাখা, সৌদি আরবের সামরিক পদক্ষেপের জবাব দেওয়া এবং আঞ্চলিক রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান জোরদার করা—সবই তাদের কৌশলের অংশ হতে পারে।
গাজা যুদ্ধের পর ইসরায়েলমুখী ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা এবং লোহিত সাগরে জাহাজে আক্রমণের মাধ্যমে তারা নিজেদের আঞ্চলিক প্রভাবও প্রদর্শন করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সামরিক পদক্ষেপের পর এসব কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হলে সংঘাতের পরিধি বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
এখানে হুথিদের ঘোষিত উদ্দেশ্য এবং তাদের হামলার বাস্তব ফল আলাদা করে দেখা প্রয়োজন। ফিলিস্তিনিদের সমর্থনের কথা বললেও বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন, বেসামরিক নাবিক এবং বিভিন্ন দেশের অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
সামনে কী হতে পারে?
সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে সংঘাত আবার তীব্র হলে ইয়েমেনের রাজনৈতিক সমাধানের পথ আরও কঠিন হতে পারে। একদিকে সৌদি আরব নিজের সীমান্ত ও জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাইবে; অন্যদিকে হুথিরা নিজেদের সামরিক সক্ষমতা ও রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ধরে রাখার চেষ্টা করবে।
ইরানকে ঘিরে বৃহত্তর সংঘাতের সঙ্গে ইয়েমেনের যুদ্ধ আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হলে পরিস্থিতি জটিল হতে পারে। কারণ, তখন হুথিদের পদক্ষেপের প্রভাব শুধু সৌদি ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ থাকবে না; লোহিত সাগর, বাব আল-মান্দেব এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারও এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়বে।
তবে সামরিক শক্তির ভারসাম্যকে শুধু অস্ত্রের সংখ্যা বা প্রতিরক্ষা বাজেট দিয়ে বিচার করা যায় না। ভূপ্রকৃতি, গোয়েন্দা তথ্য, অস্ত্রের ধরন, সরবরাহব্যবস্থা, রাজনৈতিক লক্ষ্য এবং দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা—সবই গুরুত্বপূর্ণ।
শেষ পর্যন্ত ইয়েমেন সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য শুধু সামরিক অভিযান যথেষ্ট হবে না। দেশটির রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি, ক্ষমতা ভাগাভাগি, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে সমঝোতা প্রয়োজন। অন্যথায় হুথিদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাত বারবার নতুন রূপে ফিরে আসতে পারে—যার মূল্য দিতে হবে ইয়েমেনের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারের সংশ্লিষ্ট সবাইকে।