ইরানের মিনাব ও ফিলিস্তিনের গাজায় নিহত শিশুদের স্মরণে তেহরানের পারদিসান পার্কে ঘুড়ি উড়িয়েছে শত শত শিশু। বুধবার (১৪ অক্টোবর) আয়োজিত এই ব্যতিক্রমী অনুষ্ঠানে যুদ্ধের কারণে প্রাণ হারানো শিশুদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানানো হয়। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের মধ্যে শিশুদের নিরাপত্তা, তাদের স্বাভাবিক জীবন এবং ভবিষ্যৎ রক্ষার বিষয়টিও উঠে আসে এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে।
ইরানের পরিবেশ অধিদপ্তর ও তেহরান পৌরসভার যৌথ উদ্যোগে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে বিশেষভাবে স্মরণ করা হয় গত ২৮ ফেব্রুয়ারি দক্ষিণ ইরানের মিনাব শহরের শাজারে তাইয়্যেবা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় নিহত শিশু ও শিক্ষকদের। ওই হামলায় ১৬৮ শিশু ও শিক্ষক নিহত হয়েছিলেন বলে আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়।
ঘুড়ি উৎসবের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত হয় ‘পরিবেশ ধ্বংস: নীরব যুদ্ধাপরাধ’ শীর্ষক একটি সম্মেলন। এতে শিশুদের জীবন ও নিরাপত্তার সঙ্গে যুদ্ধের কারণে পরিবেশের ওপর সৃষ্ট দীর্ঘমেয়াদি ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টিও যুক্ত করা হয়। আয়োজকদের বক্তব্যে উঠে আসে, সামরিক হামলার প্রভাব শুধু তাৎক্ষণিক প্রাণহানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; তা বেসামরিক মানুষের জীবনযাত্রা, নিরাপদ আশ্রয় এবং প্রাকৃতিক পরিবেশকেও বিপর্যস্ত করে।
ইরানের পরিবেশ অধিদপ্তরের আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি ও সম্মেলন কেন্দ্রের প্রধান আরমান খোরসান্দ বলেন, গাজা ও মিনাবের শিশুদের প্রতি সংহতি জানাতেই এই আয়োজন করা হয়েছে। এসব এলাকার বহু পরিবার হামলায় নিজেদের সন্তানদের হারিয়েছে। নিহত শিশুদের স্মরণ করা, তাদের মৃত্যুর জন্য দায়ীদের নিন্দা জানানো এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ ঠেকাতে আন্তর্জাতিক সংহতি জোরদার করাই অনুষ্ঠানের অন্যতম উদ্দেশ্য বলে জানান তিনি।
খোরসান্দ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের ইতিহাসের সমালোচনা করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি ভিয়েতনাম, ইরাক ও আফগানিস্তানের কথা উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে ফিলিস্তিন, লেবানন ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে শিশু, বেসামরিক মানুষ এবং পরিবেশের বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটনের জন্য ইসরায়েলি শাসকগোষ্ঠীর নিন্দা জানান তিনি। তাঁর বক্তব্যে এসব ঘটনার জন্য দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে একই ধরনের অপরাধ প্রতিরোধের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে শিশুদের হাতে থাকা ঘুড়িগুলোতে ইরানি ও ফিলিস্তিনি শিশুদের প্রতিনিধিত্বকারী ছবি ও প্রতীক ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে একটি ঘুড়িতে মিনাব ও গাজার নিহত শিশুদের স্মরণ করা হয়। ঘুড়িটিতে ইরানের পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রধান এবং মিনাবে নিহত দুই শিশুর পরিবারের সদস্যরা স্বাক্ষর করেন।
অন্য কয়েকটি ঘুড়িতে ছিল মুখোমুখি থাকা এক ইরানি ও এক ফিলিস্তিনি মেয়ের ছবি। আরেকটি ঘুড়িতে আঁকা হয়েছিল একটি বাড়ি, যা শিশুদের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার অধিকারের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়। এসব প্রতীকের মাধ্যমে আয়োজকেরা বোঝাতে চেয়েছেন, প্রতিটি শিশুর বিদ্যালয়ে যাওয়ার, খেলাধুলা করার এবং বোমা হামলা কিংবা বাস্তুচ্যুত হওয়ার আতঙ্ক ছাড়াই বেড়ে ওঠার অধিকার রয়েছে।
ঘুড়ি উৎসবে যুদ্ধের পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। সামরিক সংঘাতের কারণে প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস হওয়া এবং পরিবেশ দূষিত হওয়ার মতো পরিণতি সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির আহ্বান জানানো হয়। শিশুদের স্মরণে আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানটি এভাবে প্রাণহানি ও শোকের পাশাপাশি যুদ্ধের বিস্তৃত মানবিক ও পরিবেশগত ক্ষতির দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
মিনাবের বিদ্যালয়ে হামলার ঘটনা আন্তর্জাতিক পর্যায়েও নজর কেড়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শিশুরা যখন শ্রেণিকক্ষে পাঠ নিচ্ছিল, তখন শাজারে তাইয়্যেবা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলা হয়। এতে অন্তত ১৬৮ জন নিহত হন, যাঁদের মধ্যে প্রায় ১২৩ জন শিশু ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত ১৭ সেপ্টেম্বর ইরানবিষয়ক জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তথ্যানুসন্ধান মিশন জানায়, তাদের অনুসন্ধানে এমন যুক্তিসংগত ভিত্তি পাওয়া গেছে যে বেসামরিক মানুষের মৃত্যু, আহত হওয়া কিংবা বেসামরিক স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতি ঘটানো নির্বিচার হামলা চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধাপরাধ করেছে। মিনাবের বিদ্যালয়ে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যর্থতা এবং ওই সামরিক অভিযানের বিষয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুন করে নজরদারি বাড়ার প্রেক্ষাপটে এ বক্তব্য আসে।
তবে মিনাবের নিহত শিশুদের পরিবারের কাছে এসব ঘটনার ক্ষতি অপূরণীয়। যেসব শিশুর শ্রেণিকক্ষে থাকার কথা ছিল, তাদের জীবন সেখানেই থেমে গেছে। স্বজনদের হারানোর শোকের পাশাপাশি পরিবারগুলোকে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে তাদের সন্তানদের অসমাপ্ত জীবন ও ধ্বংস হয়ে যাওয়া ভবিষ্যতের বেদনা। তেহরানের এই ঘুড়ি উৎসবের মধ্য দিয়ে নিহত শিশুদের স্মৃতি ধরে রাখা এবং তাদের মৃত্যুর জন্য দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি আবারও সামনে আনা হয়েছে। সূত্র: তাসনিম নিউজ এজেন্সি