যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের মধ্যেও মিয়ানমারে জেট উড়োজাহাজের জ্বালানি পাঠাতে সক্ষম হয়েছে ইরান। একই সময়ে ওমান উপসাগর হয়ে কয়েক দফায় তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসও (এলপিজি) রপ্তানি করেছে দেশটি। তবে এসব চালান ইরানের জ্বালানি রপ্তানিতে বড় ধরনের অগ্রগতির ইঙ্গিত দেয় না; বরং দেশটির অপরিশোধিত তেল রপ্তানির বড় অংশ এখনো অবরোধের কারণে আটকে রয়েছে।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে রয়টার্স। সামুদ্রিক গোয়েন্দা সংস্থা সিনম্যাক্সের উপগ্রহচিত্র ও বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইরানি জেট জ্বালানিবাহী একটি ট্যাংকার গত সেপ্টেম্বরে মিয়ানমারে পৌঁছেছে। তবে মিয়ানমারের সামরিক সরকার দেশটি ওই চালান গ্রহণ করেছে কি না, সে বিষয়ে মন্তব্য চেয়ে পাঠানো রয়টার্সের অনুরোধের জবাব দেয়নি।
বেসামরিক নাগরিকদের ওপর সামরিক বিমান হামলার অভিযোগ তুলে ২০২৩ সালে মিয়ানমারের জেট জ্বালানি খাতের ওপর লক্ষ্যভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। তবে মিয়ানমারের সামরিক সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
ওমান উপসাগর দিয়ে এলপিজির চালান
ইরানের জ্বালানি রপ্তানির আরেকটি পথ হিসেবে ওমান উপসাগর দিয়ে এলপিজি পরিবহনের তথ্য উঠে এসেছে। ট্যাংকারের গতিবিধি এবং জাহাজ ও উপগ্রহের তথ্য বিশ্লেষণকারী সংস্থা ইউনাইটেড এগেইনস্ট নিউক্লিয়ার ইরানের (ইউএএনআই) বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময় থেকে অন্তত আটটি গ্যাসবাহী ট্যাংকার ইরানি এলপিজি নিয়ে ওমান উপসাগর ছেড়ে গেছে।
ইউএএনআইয়ের জ্যেষ্ঠ গবেষণা বিশ্লেষক জেমিমা শেলি রয়টার্সকে জানিয়েছেন, এসব চালানে মোট আনুমানিক ৪১ লাখ ব্যারেল এলপিজি ছিল। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণের কাজে নিয়োজিত চার ব্যক্তি রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ওমান উপকূলের কাছে অন্যান্য আঞ্চলিক উৎপাদকের ক্রমবর্ধমান জাহাজ-থেকে-জাহাজে পণ্য স্থানান্তরের মধ্যে নিজেদের কিছু চালান আড়াল করে পরিবহন করছে ইরান।
শেলির তথ্য অনুযায়ী, ইরানের কয়েকটি এলপিজিবাহী ট্যাংকার ওমানের শিনাস ও সোহার উপকূলীয় শহরের কাছাকাছি অন্য জাহাজে পণ্য স্থানান্তর করেছে। অন্য কয়েকটি ট্যাংকার ওমান উপসাগরে অপেক্ষা করার পর গন্তব্যের উদ্দেশে যাত্রা অব্যাহত রেখেছে।
ইউএএনআইয়ের বিশ্লেষণ বলছে, এসব ট্যাংকারের বেশির ভাগই পরে মালয়েশিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় বহিঃবন্দরসীমার দিকে গেছে, যেখানে আরও জাহাজ-থেকে-জাহাজে পণ্য স্থানান্তরের ঘটনা ঘটেছে। সংস্থাটির ধারণা, এসব চালানের চূড়ান্ত গন্তব্য হতে পারে চীন।
অপরিশোধিত তেল রপ্তানি এখনো অবরুদ্ধ
তবে ইরানের এই জ্বালানি চালানগুলো দেশটির আগের রপ্তানি কার্যক্রমের তুলনায় সামান্য অংশমাত্র। ফলে এগুলোকে মার্কিন নৌ অবরোধ এড়িয়ে ব্যাপক পরিমাণে জ্বালানি রপ্তানি পুনরায় চালুর বড় কোনো সাফল্য হিসেবে দেখা যাচ্ছে না।
শেলির মতে, এলপিজি পরিবহনের এসব ঘটনা ইরানের জ্বালানি রপ্তানির জন্য নতুন কোনো বড় কৌশলের চেয়ে সুযোগ কাজে লাগানোর প্রবণতাকেই বেশি নির্দেশ করে। ছোট জাহাজ ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য পরিবহনের কোনো নতুন ও ব্যাপক কৌশল চালু হয়েছে, এমন ইঙ্গিতও এসব চালানে পাওয়া যায় না।
জ্বালানি বাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরে ইরানের অপরিশোধিত তেল রপ্তানি শূন্যে নেমে আসে। প্রতিষ্ঠানটি ২০১৩ সালে ইরানের রপ্তানি পর্যবেক্ষণ শুরু করার পর এই প্রথম কোনো মাসে দেশটি থেকে অপরিশোধিত তেলের চালান শনাক্ত করেনি তারা।
রয়টার্স জানিয়েছে, ইউএএনআইয়ের শনাক্ত করা আটটি এলপিজিবাহী ট্যাংকারের মধ্যে ছয়টি এবং জেট জ্বালানি বহনকারী জাহাজটি ইরানি পেট্রোলিয়াম বা পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য পরিবহনের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় ছিল।
অবরোধ বহাল থাকার দাবি যুক্তরাষ্ট্রের
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড জানিয়েছে, ইরানের ওপর নৌ অবরোধ এখনো কঠোরভাবে কার্যকর রয়েছে। তবে কোনো জাহাজ অবরোধ আরোপিত এলাকার মধ্য দিয়ে চলাচল করলেই যে সেটি অবরোধ ফাঁকি দিয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না বলে রয়টার্সকে জানিয়েছেন এক মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা।
ওই কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, মার্কিন বাহিনী প্রতিটি জাহাজের বিষয় আলাদাভাবে যাচাই করে। এ ক্ষেত্রে জাহাজের নথিপত্র পর্যালোচনাসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়। মানবিক কারণে কোনো কোনো জাহাজকে চলাচলের অনুমতিও দেওয়া হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় কোনো জাহাজের নাম থাকলেই সেটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাধা দেওয়ার আওতায় আনা হয় না। আবার পরিচালনাগত কারণে কখনো কখনো মার্কিন বাহিনী কোনো জাহাজের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করলেও সেটির বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেয় না।
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ড চলতি সপ্তাহে জানিয়েছে, সর্বশেষ অবরোধ আরোপের পর তিন মাসে চারটি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের অযোগ্য করে দেওয়া হয়েছে এবং ১৩৫টি জাহাজকে ফিরে যেতে বাধ্য করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এপ্রিলে প্রথম অবরোধ আরোপ করা হয়। জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতার খসড়া তৈরি হওয়ার পর তা তুলে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই সমঝোতা ভেঙে পড়ার পর ১৪ জুলাই আবার অবরোধ কার্যকর করা হয়।
জাহাজ চলাচলের তথ্য নিয়ে ওয়াশিংটনের প্রশ্ন
জাহাজের অবস্থান ও চলাচলসংক্রান্ত তথ্যের ভিত্তিতে অবরোধ সফলভাবে এড়িয়ে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা যায় কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ও। মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেছেন, জাহাজগুলো নিজেদের অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য জাল করতে পারে কিংবা ভুয়া পরিচয়ে চলাচল করতে পারে। তাই শুধু জাহাজ চলাচলের তথ্যের ওপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
ওই মুখপাত্রের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা অভিযান ও নৌ অবরোধ ইরানের রপ্তানি আয় অর্জনের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত করে রেখেছে। এ বিষয়ে মন্তব্য চেয়ে পাঠানো রয়টার্সের অনুরোধের জবাব দেয়নি ইরান সরকার।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ভেরিস্ক ম্যাপলক্রফটের তোরবিয়র্ন সল্টভেড্ট রয়টার্সকে বলেছেন, ইরানের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি হলে বিদেশে পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য পাঠানোর ক্ষেত্রে দেশটি আরও বেশি ঝুঁকি নিতে পারে। বিশেষ করে দেশের অভ্যন্তরে বিমান চলাচলে বিধিনিষেধের কারণে শোধনাগারগুলোতে অতিরিক্ত জেট জ্বালানি জমে গেলে তা বিদেশে পাঠানোর চেষ্টা বাড়তে পারে বলে তিনি মনে করেন।
সব মিলিয়ে, মার্কিন অবরোধের মধ্যেও ইরানের কিছু জ্বালানি চালান বিদেশে পৌঁছানোর তথ্য পাওয়া গেলেও দেশটির অপরিশোধিত তেল রপ্তানি এখনো গুরুতরভাবে বাধাগ্রস্ত। সাম্প্রতিক চালানগুলো অবরোধ পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়ার প্রমাণ নয়; বরং সীমিত পরিসরে জ্বালানি পরিবহনের বিকল্প পথ ব্যবহারের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সূত্র: ইরান ইন্টারন্যাশনাল