ইরানকে দুর্বল করতে চাওয়া যুদ্ধই জাতীয় সংহতি জোরদার করেছে 

যে যুদ্ধের মাধ্যমে ইরানকে দুর্বল করা এবং দেশটির জনগণকে রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর পরিকল্পনা করা হয়েছিল, সেই যুদ্ধই উল্টো জাতীয় সংহতি জোরদার করেছে এবং ওয়াশিংটনের হিসাব-নিকাশ বদলে দিয়েছে। ইরানের জনগণের এই প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে দিয়েছে, বিদেশি আগ্রাসনের মুখে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও জাতীয় প্রতিরক্ষার প্রশ্নে মানুষ ঐক্যবদ্ধ হতে পারে।
 
সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের কৌশল প্রণয়নকারীদের ধারণার বিপরীতে ইরানের জনগণ অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন বিষয়ে অসন্তোষ এবং বিদেশি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দেশকে রক্ষার প্রয়োজনীয়তার মধ্যে পার্থক্য করেছে। এই পার্থক্য উপেক্ষা করাই এমন কৌশলের ব্যর্থতার কারণ হতে পারে, যেগুলো ইরানের অভ্যন্তরীণ ঐক্য ক্ষয় হওয়ার প্রত্যাশার ওপর নির্ভরশীল।
 
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাময়িকী ফরেন অ্যাফেয়ার্সের ‘ইরানের বিজয়ের তত্ত্ব’ শীর্ষক এক বিশ্লেষণেও বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। বিশ্লেষণটিতে বলা হয়েছে, সামরিক হামলা ও অর্থনৈতিক চাপ প্রাথমিক প্রত্যাশা অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কৌশলগত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। ইরানের জনগণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধকে মুক্তি এনে দেওয়ার উদ্যোগ হিসেবে দেখছে না; বরং তারা একে অযৌক্তিক আগ্রাসন হিসেবে বিবেচনা করছে। এর ফলে সৃষ্ট জাতীয়তাবোধ রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠীগুলোর মধ্যকার বিভাজনকে অনেক ক্ষেত্রে আড়াল করেছে এবং নতুন করে রাজনৈতিক অভ্যুত্থান গড়ে ওঠার সম্ভাবনাও কমিয়েছে। বিশ্লেষণটির ভাষ্য অনুযায়ী, এই যুদ্ধ ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে শক্তিশালী করেছে।
এই মূল্যায়নের গুরুত্ব হলো, কোনো সংঘাতের ফলাফল কেবল সামরিক ক্ষয়ক্ষতি, অবকাঠামোর ধ্বংস কিংবা অর্থনৈতিক চাপের মাত্রা দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না। কৌশলগত হিসাব-নিকাশে সমাজের প্রতিক্রিয়া এবং সংকটের মুখে জনগণের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কোনো দেশ গুরুতর অর্থনৈতিক সংকটে পড়তে পারে, তার অবকাঠামোর কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে; কিন্তু এর অর্থ স্বয়ংক্রিয়ভাবে রাজনৈতিক পরাজয় বা জাতীয় সংহতির পতন নয়। বিশেষ করে জনগণ যখন সংকটের মূল কারণ হিসেবে অভ্যন্তরীণ বিরোধের পরিবর্তে বিদেশি হামলা এবং দেশের অস্তিত্বের প্রতি হুমকিকে দেখে, তখন পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়াও ভিন্ন হতে পারে।
 
অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ ও বিদেশি আগ্রাসনের প্রতিক্রিয়ার পার্থক্য
 
ওয়াশিংটনের অন্যতম ভুল হিসাব হলো, ইরানের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসন্তোষের সঙ্গে বিদেশি সামরিক হামলার মুখে সমাজের প্রতিক্রিয়ার পার্থক্যকে উপেক্ষা করা। জীবনযাত্রার পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তোষ, রাজনৈতিক দাবি এবং কর্মকর্তাদের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা, এসব বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে এসব দাবি ও অসন্তোষের অস্তিত্ব থেকে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না যে, বিদেশি চাপের মুখে ইরানের জনগণ ঠিক সেই পথেই এগোবে, যা চাপ প্রয়োগের কৌশলপ্রণেতারা প্রত্যাশা করছেন।
 
বিদেশি চাপের কারণে সমাজের অগ্রাধিকার বদলে যেতে পারে। মানুষ যখন নিজেদের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা কিংবা ভূখণ্ডের অখণ্ডতাকে হুমকির মুখে মনে করে, তখন অভ্যন্তরীণ বিরোধ সাময়িকভাবে পেছনে পড়ে যেতে পারে এবং দেশকে রক্ষা করাই হয়ে উঠতে পারে সবার অভিন্ন অগ্রাধিকার। এর অর্থ এই নয় যে সব মতপার্থক্য মুছে গেছে কিংবা সমালোচনার অবসান ঘটেছে। বরং এটি দেখায়, রাজনৈতিক বিরোধের বাইরেও জাতীয় পরিচয় ও দেশের স্বাধীনতার প্রতি সংবেদনশীলতা স্বতন্ত্র শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে।
 
এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, বোমাবর্ষণ ও অর্থনৈতিক চাপ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইরানের রাজনৈতিক কাঠামোর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ সৃষ্টি করবে, এমন প্রত্যাশা দেশটির সমাজ সম্পর্কে অসম্পূর্ণ ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এ ধরনের প্রত্যাশায় জনগণকে সামরিক চাপের অধীন একটি উপাদান হিসেবে দেখা হয়, যেন অর্থনৈতিক ও মানবিক ক্ষয়ক্ষতি যত বাড়বে, আগ্রাসী পক্ষের লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে সমাজের অবস্থান তত বেশি মিলে যাবে। অথচ অনেক পরিস্থিতিতে বিদেশি হামলা অভিন্ন হুমকির অনুভূতি জোরদার করতে পারে এবং আক্রান্ত দেশের জনগণের সঙ্গে হামলাকারীদের দূরত্ব আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
 
কেন বিদেশি চাপ উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে
 
অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপের মাধ্যমে কৌশলপ্রণেতাদের কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক পরিবর্তন তখনই ঘটতে পারে, যখন প্রয়োগ করা চাপের সঙ্গে প্রত্যাশিত রাজনৈতিক ফলাফলের নির্ভরযোগ্য সম্পর্ক থাকে। কিন্তু এই সম্পর্ক নিশ্চিত নয় এবং সব সমাজে একইভাবে কাজও করে না। নিষেধাজ্ঞা মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়াতে পারে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত করতে পারে এবং সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তবে এসব চাপের ফলে সরকার দুর্বল হবে, বিরোধীরা শক্তিশালী হবে, নাকি জাতীয় সংহতি বাড়বে, তা নির্ভর করে বহু বিষয়ের ওপর।
 
এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জনগণ বিদেশি চাপের উদ্দেশ্যকে কীভাবে দেখছে। মানুষ যদি মনে করে বিদেশি পদক্ষেপ তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করার জন্য নেওয়া হচ্ছে, তাহলে তাদের প্রতিক্রিয়া এক রকম হতে পারে। অন্যদিকে, এসব পদক্ষেপকে রাজনৈতিক ইচ্ছা চাপিয়ে দেওয়া কিংবা দেশকে দুর্বল করার চেষ্টা হিসেবে দেখলে প্রতিক্রিয়া ভিন্ন হতে পারে। সামরিক হামলার সঙ্গে যখন অবকাঠামো ও জাতীয় সক্ষমতার ওপর ব্যাপক হুমকি যুক্ত হয়, তখন সংকটটি কেবল সরকারের সঙ্গে বিরোধের বিষয় নয়, বরং দেশের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের প্রশ্ন, এমন ধারণা আরও শক্তিশালী হতে পারে।
ফরেন অ্যাফেয়ার্সের বিশ্লেষণেও সমাজের পরিবেশে এই পরিবর্তনের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিদেশি হামলা বিদ্যমান রাজনৈতিক বিভাজনকে ব্যাপক অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দেওয়ার পরিবর্তে কখনো কখনো জাতীয়তাবোধ জোরদার করেছে এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর মধ্যকার বিভাজনকে আড়াল করেছে। এ প্রক্রিয়া দেখায়, কিছু মার্কিন নীতিনির্ধারকের ধারণার বিপরীতে বাইরের চাপ জাতীয় সংকল্পকে দুর্বল করার বদলে দেশ রক্ষার প্রেরণা বাড়াতে পারে। সংকটের আগে যেসব গোষ্ঠীর মধ্যে গুরুতর মতপার্থক্য ছিল, তারাও দেশের প্রতিরক্ষার প্রশ্নে কাছাকাছি আসতে পারে।
 
সংঘাতের ফল নির্ধারণে জনগণই গুরুত্বপূর্ণ উপাদান
 
জাতীয় শক্তি শুধু অস্ত্রের সক্ষমতা, অর্থনৈতিক সামর্থ্য কিংবা উন্নত প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সংকটের সময় সামাজিক সংহতি ধরে রাখার ক্ষমতাও একটি দেশের শক্তির অংশ। যে দেশ বাইরের চাপের মুখে সামাজিক বন্ধন ও জাতীয় দায়িত্ববোধ বজায় রাখতে পারে, তার এমন একটি সক্ষমতা থাকে, যা কেবল সামরিক হিসাব-নিকাশ দিয়ে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।
 
এই প্রেক্ষাপটে ইরানের জনগণের ভূমিকাকে দেশটির ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার আলোকে দেখতে হবে। স্বাধীনতা, বিদেশি হস্তক্ষেপ এবং বৃহৎ শক্তির ইচ্ছা চাপিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টার বিষয়ে সংবেদনশীলতা ইরানিদের রাজনৈতিক স্মৃতি গঠনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এর অর্থ এই নয় যে অভ্যন্তরীণ বিষয় কিংবা পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে সব ইরানির মতামত এক। বরং এটি দেখায়, বাইরের হুমকি যখন প্রধান হয়ে ওঠে, তখন স্বাভাবিক সময়ে বহু বিষয়ে মতভিন্নতা থাকা গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে জাতীয় পরিচয় অভিন্ন ভিত্তি হিসেবে কাজ করতে পারে।
অবশ্য সংকটের সময় জাতীয় সংহতি জোরদার হওয়াকে সামাজিক দাবি কিংবা অর্থনৈতিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান হিসেবে দেখা উচিত নয়। জীবনযাত্রার ব্যয় ও অর্থনৈতিক চাপ মানুষের ওপর প্রভাব ফেলতেই পারে। বাইরের হুমকি কমে গেলে অভ্যন্তরীণ দাবিগুলো আবারও সামনে আসতে পারে। তবে এই পার্থক্যই দেখায়, অভ্যন্তরীণ অসন্তোষকে বিদেশি সামরিক ও রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের নিশ্চিত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। কোনো সমাজ তার সরকারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করলেই যে তারা বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপ কিংবা নিজেদের দেশকে দুর্বল করে দেওয়ার পক্ষে থাকবে, এমন নয়।
 
মার্কিন নীতিনির্ধারকদের জন্য এই বাস্তবতার বার্তা হলো, জাতীয় পরিচয়, ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা এবং স্বাধীনতার প্রতি সংবেদনশীলতা বিবেচনায় না নিয়ে ইরানি সমাজকে বোঝার চেষ্টা করলে মূল্যায়ন অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। চাপ বাড়ালেই জনগণের রাজনৈতিক অবস্থান ওয়াশিংটনের প্রত্যাশা অনুযায়ী বদলে যাবে, এমন ধারণার ওপর নির্ভর করলে নীতিনির্ধারকেরা নিজেদের সিদ্ধান্তের প্রকৃত পরিণতি বুঝতে ব্যর্থ হতে পারেন।
শেষ পর্যন্ত ইরানের বিরুদ্ধে কোনো কৌশল সফল হয়েছে কি না, তা শুধু হামলার সংখ্যা, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কিংবা নিষেধাজ্ঞার কঠোরতা দিয়ে বিচার করা সম্ভব নয়। এসব পদক্ষেপ কী ধরনের রাজনৈতিক ও সামাজিক ফল তৈরি করেছে এবং জনগণকে কৌশলপ্রণেতাদের ঘোষিত লক্ষ্যের দিকে পরিচালিত করতে পেরেছে কি না, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে। ফরেন অ্যাফেয়ার্সের বিশ্লেষণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশা ও ইরানি সমাজের প্রতিক্রিয়ার মধ্যকার ব্যবধানকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জনগণের ভূমিকা উপেক্ষা করাকে এসব হিসাব-নিকাশের অন্যতম দুর্বলতা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। কারণ, বাইরের চাপ অভ্যন্তরীণ সংহতির পতন ঘটাবেই, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই; বরং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে তা দেশের প্রতিরক্ষায় জাতীয় সংকল্পকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। সূত্র: মেহর নিউজ এজেন্সি