যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে আগের সংঘাতগুলোতে ইরান তার সব সামরিক সক্ষমতা ব্যবহার করেনি বলে জানিয়েছেন দেশটির সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মেজর জেনারেল মোহসেন রেজাই। তাঁর দাবি, নতুন করে আগ্রাসন চালানো হলে জবাব দেওয়ার জন্য ইরানের হাতে আরও সামরিক সক্ষমতা রয়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে আরেকটি যুদ্ধের আশঙ্কা কমাতে পারে, এমন শর্তে বর্তমান সংঘাতের স্থায়ী অবসান চান তিনি।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম ড্রপ সাইট নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন রেজাই। তিনি জানান, আগের যুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়ে সংঘাতের তীব্রতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ইরান ধাপে ধাপে আরও সামরিক সক্ষমতা কাজে লাগিয়েছে। তবে দেশটির হাতে থাকা সব সক্ষমতা তখনো ব্যবহার করা হয়নি।
রেজাই বলেন, আগের পর্যায়গুলোতে ইরান তার সব সক্ষমতা কাজে লাগায়নি। যুদ্ধের তীব্রতা অনুযায়ী আরও সক্ষমতা সক্রিয় করা হয়েছে এবং পরবর্তী পর্যায়ের জন্যও তারা প্রস্তুত। তাঁর ভাষ্য, নতুন করে আগ্রাসন চালানো হলে তার জবাব দেওয়ার মতো সামরিক সামর্থ্য ইরানের রয়েছে।
ইরানের সামরিক প্রস্তুতির বিষয়ে তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৃহত্তর পরিসরের যুদ্ধের সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে কয়েক দশক ধরে প্রস্তুতি নিয়েছে তেহরান। এ প্রস্তুতির অংশ হিসেবে উৎপাদনব্যবস্থা বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে দেওয়া, ভূগর্ভস্থ স্থাপনা গড়ে তোলা, বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণব্যবস্থা তৈরি এবং ক্ষয়ক্ষতি মেরামত করে হারানো সামরিক সরঞ্জামের ঘাটতি পূরণের সক্ষমতা অর্জনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
রেজাইর মতে, কোনো দেশের সামরিক শক্তি কেবল গুদামে কতটি ক্ষেপণাস্ত্র অবশিষ্ট আছে, তা দিয়ে বিচার করা যায় না। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে নিয়মিত অস্ত্র উৎপাদন, সেগুলো মোতায়েন এবং পাল্টা জবাব দেওয়ার সক্ষমতা ধরে রাখাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধ শুরুর কয়েক মাস পরও প্রতিপক্ষকে ক্ষতির মুখে ফেলার সামর্থ্য ইরান দেখিয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, ইরানের লক্ষ্য ২০২৯ সাল পর্যন্ত টিকে থাকা নয়; বরং এমন শর্তে যুদ্ধের অবসান ঘটানো, যাতে আরেকটি যুদ্ধের সম্ভাবনা কমে আসে।
অর্থনৈতিক যুদ্ধের জবাব নিয়েও সতর্কবার্তা
ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব সতর্ক করে বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক যুদ্ধে অংশ নিয়েও কোনো দেশ নিজেদের ঝুঁকির বাইরে রাখতে পারবে, এমনটা ভাবা উচিত নয়। তাঁর বক্তব্য, ইরানের অর্থনৈতিক জীবনরেখায় আঘাত হানা হবে, অথচ সেই আক্রমণ সম্ভব করে তোলা অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ নিরাপদ রাখা হবে, এমন কোনো ব্যবস্থা মেনে নেওয়া যায় না।
সাক্ষাৎকারে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার প্রক্রিয়া নিয়েও কথা বলেন রেজাই। তাঁর দাবি, প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ভুল ক্রম অনুসরণ করায় যুদ্ধ অবসানের চুক্তি ব্যর্থ হয়েছে। তিনি বলেন, ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার পর নৌ চলাচল আবার শুরু হয়েছিল। কিন্তু অপর পক্ষের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতিগুলো এমনভাবে বাস্তবায়ন করা হয়নি, যাতে চুক্তিটি টেকসই হতে পারে।
রেজাই আরও বলেন, আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা অব্যাহত রাখবে ইরান এবং এ অবস্থান থেকে সরে আসবে না। মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে জানানো সাতটি নতুন শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কৌশলগত এই জলপথ পুনরায় খুলে দেওয়া কিংবা আলোচনায় ফেরার প্রশ্নেও তেহরান অনড় রয়েছে বলে জানান তিনি।
তবে কূটনীতির পথ পুরোপুরি পরিত্যাগ করছে না ইরান। রেজাইর ভাষ্য, তেহরান আগের কূটনৈতিক পদ্ধতিতে আর ফিরে যাবে না, কিন্তু কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও ছেড়ে দেবে না।
ইরানের এই নিরাপত্তাপ্রধানের বক্তব্যে একদিকে সামরিক সক্ষমতা ধরে রাখা ও নতুন আগ্রাসনের জবাব দেওয়ার প্রস্তুতির কথা উঠে এসেছে, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ সংঘাতের ঝুঁকি কমাতে শর্তসাপেক্ষে যুদ্ধের অবসানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে রেজাইর এসব বক্তব্য ও শর্তের বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি। সূত্র: প্রেস টিভি