নির্বাচনের আগে ইরানে হামলার প্রয়োজন দেখছি না: ইসরায়েলি সেনাপ্রধান

ইসরায়েলের পরবর্তী সপ্তাহের নির্বাচনের আগে ইরানে সামরিক হামলার প্রয়োজন দেখছেন না দেশটির প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়াল জামির। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল ১৩-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্প্রতি এক ব্যক্তিগত বৈঠকে জামির এ অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। তবে পরিস্থিতি পর্যালোচনায় হামলার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলে সামরিক বাহিনী তা চালাতে প্রস্তুত বলেও জানিয়েছেন তিনি।

জামিরকে উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচনের আগে ইরানে হামলার প্রয়োজনীয়তার কোনো ইঙ্গিত তাঁরা দেখতে পাচ্ছেন না। তবে হামলা প্রয়োজন বলে সিদ্ধান্ত হলে তা চালানো হবে। আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, যুদ্ধ পুনরায় শুরু করার উদ্যোগ নিয়ে তিনি নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে কিংবা ভোট পিছিয়ে দিতে চাইছেন। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নেতানিয়াহু। তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ও ইয়াশার পার্টির নেতা গাদি আইজেনকটও বৃহস্পতিবার একই ধরনের অবস্থান জানান। চ্যানেল ১৩-কে তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে যুদ্ধ শুরু করার মতো ইরানের কোনো সরাসরি ও তাৎক্ষণিক হুমকি নেই।

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলা ঘিরে উত্তেজনা

ইরানে হামলার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ইসরায়েলি নেতাদের এমন বক্তব্যের মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। বৃহস্পতিবার ইরান জানিয়েছে, রাতভর হরমুজ প্রণালিতে সাতটি তেলবাহী জাহাজে হামলা হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটিতে আগুন ধরে যায়, অন্যগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তেহরানের দাবি, এসব জাহাজ ইরানের হামলার শিকার হয়েছে অথবা নৌমাইনে আঘাত পেয়েছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের প্রতিবেদনে দেশটির বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নৌবাহিনীর বরাত দিয়ে এসব তথ্য জানানো হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) জানিয়েছে, তারা স্বাধীনভাবে এসব হামলার সত্যতা যাচাই করতে পারেনি। প্রতিবেদনে হতাহতের কোনো তথ্যও দেওয়া হয়নি।

একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা অব্যাহত রাখলে ওই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে হামলার হুমকি দিয়েছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নৌবাহিনী। গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণের দাবি বজায় রেখেছে তেহরান। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধের আলোচনা ও সমঝোতার ক্ষেত্রেও হরমুজ প্রণালি ইরানের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত হাতিয়ার।

যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ সংস্থা ইউকে মেরিটাইম ট্রেড অপারেশন্সের তথ্য অনুযায়ী, মার্চে যুদ্ধের শুরুর দিকের পর অক্টোবর মাসেই বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার সবচেয়ে বেশি খবর পাওয়া গেছে। সংস্থাটি সর্বশেষ হামলাগুলোর কথা জানায়নি। তবে কিছু জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান নিরাপত্তাজনিত ঘটনার তথ্য প্রকাশে আগের তুলনায় অনীহা দেখাচ্ছে বলে জানিয়েছে।

কূটনীতির পাশাপাশি সামরিক প্রস্তুতি বাড়াচ্ছে দুই পক্ষ

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বুধবার জানিয়েছেন, তেহরান সতর্ক অবস্থানে থাকলেও কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোলা রাখতে চায়। একই সঙ্গে আত্মরক্ষার জন্য প্রস্তুত রয়েছে দেশটি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া যুদ্ধ থেকে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক শিক্ষা নেওয়ার কথাও জানিয়েছে ইরান। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে দেশটি সমুদ্রের তলদেশের যোগাযোগ কেবল ও তথ্যকেন্দ্রের মতো অবকাঠামোকেও সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর আওতায় আনার ইঙ্গিত দিয়েছে।

অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। অঞ্চলটিতে তৃতীয় একটি বিমানবাহী রণতরিসহ আরও সামরিক সরঞ্জাম ও কয়েক হাজার সেনা পাঠানো হচ্ছে। কয়েক দশকের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় যুদ্ধজাহাজ ও সামরিক বিমানের বহরগুলোর একটি সেখানে মোতায়েন রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটন ও তেহরানকে আনুষ্ঠানিক আলোচনায় ফেরাতে মধ্যস্থতাকারীরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ইরান এমন একটি প্রস্তাব দিয়েছে, যার আওতায় যুক্তরাষ্ট্র কয়েকটি শর্ত মেনে নিলে এক সপ্তাহের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়ার কথা রয়েছে। শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে ইরানের বন্দর অবরোধ প্রত্যাহার, দেশটির তেল রপ্তানির ওপর বিধিনিষেধ শিথিল, জব্দ করা সম্পদ ছাড় এবং সব রণাঙ্গনে সংঘাত বন্ধ করা।

এর আগে জুনে স্বাক্ষরিত একই ধরনের একটি সমঝোতা কয়েক দিনের মধ্যেই ভেঙে পড়ে। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ইরানের সর্বশেষ সাত দিনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে দুই পক্ষই স্বীকার করেছে, পরোক্ষ আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।

মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর হামলার পরিকল্পনার খবর

এদিকে আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে নতুন করে সামরিক হামলার পরিকল্পনা করেছে ওয়াশিংটন ও তেল আবিব, এমন খবর প্রকাশ করেছে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস। বুধবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে মার্কিন কর্মকর্তা এবং বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিদের বরাত দিয়ে বলা হয়, সম্ভাব্য স্বল্পস্থায়ী কিন্তু তীব্র সামরিক অভিযানের প্রস্তুতিতে দুই দেশ সামরিক মহড়া জোরদার করেছে। ইরানের কাছে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানের উড্ডয়নও সম্ভাব্য হামলার অনুশীলনের অংশ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা, জ্বালানি অবকাঠামো এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের অস্ত্রভান্ডার রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানে হামলা পুনরায় শুরু করতে আগ্রহী নেতানিয়াহু; তবে ট্রাম্প তাঁকে আপাতত সংযত থাকতে বলেছেন এবং মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চান। বৃহস্পতিবার এসব আলোচনা নিয়ে প্রকাশিত খবরকে ভুল বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন নেতানিয়াহু। ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর কথোপকথনের বিস্তারিত জানাতেও রাজি হননি তিনি।

এর আগে ৯ অক্টোবর ট্রাম্প বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের আগে ওয়াশিংটন ইরানে হামলা চালাবে না। অন্য একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, জামির মার্কিন জেনারেলদের সতর্ক করে বলেছেন, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ইরানে হামলা হলে ইসরায়েলের দিকে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাতে পারে তেহরান। এতে ২৭ অক্টোবরের ইসরায়েলি নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। সূত্র: টাইমস অব ইসরায়েল