সৌদি আরবের বিরুদ্ধে প্রচারণা জোরদার করতে নতুন কৌশল নিয়েছে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী গোষ্ঠী। সামরিক হামলার পাশাপাশি এবার যুক্তরাষ্ট্রের কুখ্যাত যৌন অপরাধী ও অর্থলগ্নিকারী জেফরি এপস্টেইনকে ঘিরে বিতর্ককে সৌদির বিরুদ্ধে প্রচারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে তারা। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-এর এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, হুতিদের এই প্রচারাভিযানে বিবৃতি, ভিডিও, গান, বক্তৃতা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবশালীদের পোস্ট ব্যবহার করা হচ্ছে। চলতি গ্রীষ্মে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত নতুন করে তীব্র হওয়ার পর তাদের এ ধরনের প্রচারণা আরও গতি পেয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই প্রচারণায় নিজেদের ইসলামের রক্ষক এবং বিদেশি প্রভাবের বিরোধী শক্তি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে হুতি গোষ্ঠী।
গত মাসে সৌদি আরব অভিযোগ করেছিল, হুতিরা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে পবিত্র নগরী মক্কাকে লক্ষ্যবস্তু করার চেষ্টা করেছে। তবে হুথি গোষ্ঠী এ অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে।
এরপর হুথিদের প্রেসিডেন্ট মাহদি আল-মাশাতের নামে প্রচারিত এক বক্তব্যে বলা হয়, ‘যারা এপস্টেইনকে কাবার গিলাফ দিয়েছিল, তারাই মক্কাকে লক্ষ্যবস্তু করছে।’ হুতিদের সরকারি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বক্তব্যের বরাতে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস এ তথ্য জানিয়েছে।
এপস্টেইন-সংক্রান্ত নথিপত্র প্রকাশের পর সৌদি আরবের কর্মকর্তারা হুতিদের এই অভিযোগ কিংবা কাবার গিলাফ নিয়ে উত্থাপিত দাবির বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণের বিস্তারিত দেওয়া হয়নি। ফলে এপস্টেইন বা কাবার গিলাফের প্রসঙ্গ টেনে সৌদি আরবকে মক্কায় হামলার সঙ্গে যুক্ত করার দাবিকে প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
হুতিদের বক্তব্য বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবশালীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে বলে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
ইয়েমেনের কৌতুকশিল্পী মুস্তাফা আল-মোমারি এপস্টেইনকে ঘিরে হুতিদের বক্তব্য নিয়ে একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তাঁর ২৭ লাখের বেশি অনুসারী রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইয়েমেনের একজন ঐতিহ্যবাহী সংগীতশিল্পীও একই অভিযোগকে কেন্দ্র করে একটি গান তৈরি করেছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালে কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর মুস্তাফা আল-মোমারির অবস্থানে পরিবর্তন আসে এবং তিনি হুতি ও সৌদি আরবের বিষয়ে ভিন্নভাবে মন্তব্য করতে শুরু করেন। তিনি সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানেরও সমালোচনা করেছেন।
হুতিদের নেতা আবদুল মালিক আল-হুতির বক্তৃতাতেও এপস্টেইনের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। গত ফেব্রুয়ারিতে এক বক্তব্যে তিনি এপস্টেইন-সংক্রান্ত নথিপত্রকে গুরুত্ব দিয়ে দেখার আহ্বান জানান এবং এগুলোকে নেতাদের ও অভিজাত শ্রেণির প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত একটি ‘জায়নবাদী কেন্দ্র’-এর প্রমাণ হিসেবে বর্ণনা করেন। এটি তাঁর বক্তব্য; দাবিটির পক্ষে প্রতিবেদনে স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ তুলে ধরা হয়নি।
এপস্টেইন-সংক্রান্ত নথিপত্র নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে চলমান আলোচনা হুতিদের প্রচারণায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে বলে প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-এর তথ্য অনুযায়ী, ডানপন্থী জনপ্রিয় পডকাস্টার জেক শিল্ডস এপস্টেইন-সংক্রান্ত নথি নিয়ে নিয়মিত পোস্ট করেন। এক পর্যায়ে তিনি হুতিদের কার্যক্রমের প্রশংসা করে বলেন, তিনি গোষ্ঠীটির বড় ভক্ত এবং তাদের বেশ সাহসী বলে মনে করেন।
এ ধরনের প্রতিক্রিয়া হুতিদের প্রচারণা বৃহত্তর অনলাইন পরিসরে পৌঁছানোর একটি উদাহরণ হিসেবে প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। তবে একটি অনলাইন ব্যক্তিত্বের মন্তব্য থেকে হুতিদের প্রচারাভিযান কতটা কার্যকর হয়েছে, তার সামগ্রিক মূল্যায়ন করা যায় না।
হুতিদের এই কৌশল দেখায়, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে সামরিক পদক্ষেপের পাশাপাশি তথ্য ও প্রচারণাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভিডিও, গান, বক্তৃতা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে কোনো গোষ্ঠী নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরতে পারে, প্রতিপক্ষের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করতে পারে এবং আন্তর্জাতিক জনমতকে প্রভাবিত করতে পারে।
তবে প্রচারণায় কোনো অভিযোগ বারবার প্রচারিত হওয়া মানেই সেটি সত্য—এমন নয়। মক্কাকে লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগ হুতি গোষ্ঠী অস্বীকার করেছে; আর এপস্টেইন ও কাবার গিলাফকে যুক্ত করে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে যে বক্তব্য প্রচার করা হচ্ছে, তার সত্যতা প্রতিষ্ঠার মতো স্বাধীন প্রমাণ প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অবলম্বনে।