প্রথম অধিবেশনেই নেতানিয়াহুর স্পিকার আমির ওহানাকে সরানোর উদ্যোগ

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো নতুন পার্লামেন্টের (নেসেট) অধিবেশন শুরুর পরপরই বর্তমান স্পিকার আমির ওহানাকে সরিয়ে নতুন স্পিকার নিয়োগের পরিকল্পনা করছে। শুক্রবার প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

আগামী ১০ নভেম্বর ইসরায়েলের ২৬তম নেসেটের শপথ গ্রহণের কথা রয়েছে। বিরোধী দলগুলোর পরিকল্পনা অনুযায়ী, সেদিনই স্পিকার পরিবর্তনের বিষয়ে ভোট হতে পারে। নতুন সরকার গঠনের আলোচনা চললেও স্পিকার নিয়োগের উদ্যোগ থেমে থাকবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে।

‘চেঞ্জ ব্লক’ নামে পরিচিত বিরোধী জোটে রয়েছে ইয়াশার, বি’ইয়াচাদ, দ্য ডেমোক্র্যাটস ও ইসরায়েল বেইতেনু। আরব নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট লিস্ট ও রা’আম দলও তাদের সঙ্গে রয়েছে। ১২০ আসনের নেসেটে এই দলগুলোর সম্মিলিত আসন ৬৭টি। ফলে বর্তমান স্পিকার ওহানাকে সরানোর মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা তাদের রয়েছে।

চ্যানেল ১২-এর রাজনৈতিক বিশ্লেষক বারাক সেরি শুক্রবার জানান, ওহানাকে সরানোর বিষয়ে বিরোধীদের মধ্যে সমঝোতা হয়ে গেছে। সম্ভাব্য নতুন স্পিকার হিসেবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইয়ার লাপিদের নামও আলোচনায় এসেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

চ্যানেল ১২-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দ্য ডেমোক্র্যাটস দলের প্রধান ইয়ার গোলান বলেন, ২৬তম নেসেটের শপথ গ্রহণের পর তাদের প্রথম কাজ হবে নতুন স্পিকার নিয়োগ। এরপর পার্লামেন্টের বিভিন্ন কমিটির প্রধান নির্বাচন এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে দক্ষিণ ইসরায়েলে হামলার সময়কার ব্যর্থতা তদন্তে রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন গঠন করা হবে।

তবে স্পিকার পরিবর্তনের উদ্যোগে বিরোধী দলগুলোর মধ্যে পুরোপুরি ঐকমত্য নেই। কান নিউজ জানিয়েছে, ইসরায়েল বেইতেনু দলের নেতা আভিগদর লিবারম্যান আরব দলগুলোর সঙ্গে সহযোগিতায় অনাগ্রহী। অথচ স্পিকার পরিবর্তনের ভোটে তাদের সমর্থন প্রয়োজন হতে পারে।

লিবারম্যান সরাসরি পক্ষে ভোট দিতে না চাইলে তাঁর দলকে ভোটদানে বিরত থাকার অনুরোধ জানাচ্ছেন অন্য বিরোধী নেতারা। এতে পার্লামেন্টে বিরোধী জোটের পক্ষে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া সম্ভব হতে পারে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

অন্যদিকে ইয়ার গোলান মনে করেন, আরব দলগুলোর সমর্থন নিয়ে বিরোধীরা পরবর্তী সরকার গঠন করতে পারবে। তিনি জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার ইয়াশার নেতা গাদি আইজেনকট, বি’ইয়াচাদের দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা ইয়ার লাপিদ এবং রা’আম প্রধান মানসুর আব্বাসের সঙ্গে তাঁর বৈঠক হয়েছে। তিনজনই সরকার গঠনের বিষয়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলে তাঁর দাবি।

গোলানের প্রস্তাব অনুযায়ী, রা’আম সরকারে যোগ দিতে পারে এবং জয়েন্ট লিস্ট বাইরে থেকে সরকারকে সমর্থন দিতে পারে। তবে ইসরায়েলি জনমতের সংবেদনশীলতার কথা বিবেচনায় নিয়ে আরব দলগুলো নিরাপত্তা মন্ত্রিসভায় কোনো পদ দাবি করবে না বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টিকে নিয়ে কোনো ঐক্য সরকার গঠনের সম্ভাবনাও নাকচ করেছেন গোলান। তিনি বলেন, “একেবারেই না। সেটি হবে আরেকটি নেতানিয়াহু সরকার। তিনি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক।”

গোলান আরও বলেন, বিরোধী দলগুলোর ১২০ আসনের মধ্যে মাত্র ৪৮টি থাকলেও সরকার গঠন করা সম্ভব। রা’আমের ৮টি আসন যুক্ত হলে তাদের সংখ্যা দাঁড়াবে ৫৬। জয়েন্ট লিস্টের রয়েছে আরও ১১টি আসন।

লিবারম্যান শুক্রবার আবারও জানিয়েছেন, রা’আম ও জয়েন্ট লিস্টকে নিয়ে কোনো জোট সরকারে যোগ দেবে না তাঁর দল। ফেসবুকে তিনি লেখেন, “আমরা সন্ত্রাসবাদের সমর্থকদের সঙ্গে বসব না!”

নিজের অবস্থানের পক্ষে জয়েন্ট লিস্টের আইনপ্রণেতা ওফের কাসিফের আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার গণহত্যা মামলার সমর্থন, রা’আমের আইনপ্রণেতা ইয়াসের হুজাইরাতের হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন বলতে অস্বীকৃতি এবং জয়েন্ট লিস্টের ওসামা সাদির নির্বাচনের রাতে ফিলিস্তিনি জাতীয় সংগীত গাওয়ার বিষয়গুলো উল্লেখ করেন তিনি।

লিবারম্যানের ভাষ্য, “যারা সন্ত্রাসবাদের সমর্থকদের ওপর নির্ভর করতে চায়, তারা তা করতে পারে। ইসরায়েল বেইতেনু এর অংশ হবে না।”

এদিকে সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সাবেক প্রধান মোশে ইয়ালোন আরব দল রা’আমের সঙ্গে সহযোগিতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া দীর্ঘ পোস্টে তিনি ইহুদি নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলগুলোকে রা’আমের সঙ্গে সরকার গঠন এবং দলটির নেতা মানসুর আব্বাসকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানান।

ইয়ালোন আব্বাসকে ‘সাহসী আরব-ইসরায়েলি নেতা’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তাঁর দাবি, আব্বাস ইসরায়েলকে ইহুদি ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন এবং সামরিক বাহিনী অথবা জাতীয় সেবায় সর্বজনীন নিয়োগের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

ইয়ালোন রা’আম নেতার অবস্থানের সঙ্গে উগ্র ডানপন্থী মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির ও বেজালেল স্মোত্রিচের অবস্থানের তুলনা করেন। ২০২১ সালের মে মাসে ইহুদি ও আরব অধ্যুষিত শহরগুলোতে সংঘর্ষের সময় মানসুর আব্বাসের ভূমিকার প্রশংসা করে তিনি বলেন, আব্বাস তখন সহিংসতা প্রশমনে কাজ করেছিলেন।

বেন-গভির ও স্মোত্রিচের অতীত কর্মকাণ্ড নিয়েও অভিযোগ তোলেন ইয়ালোন। তাঁর মতে, ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বর্ণবাদী ও উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনীতির পরিবর্তে আব্বাসের মতো নেতাদের মূল্যবোধকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

তিনি বলেন, “মানসুর আব্বাসকে ইসরায়েলি সরকারে মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন।”

এদিকে ১০ নভেম্বর শপথ গ্রহণের আগে ২৬তম নেসেটে প্রবেশ করতে যাওয়া দলগুলো নিজেদের পার্লামেন্টারি গ্রুপের প্রধান নিয়োগ শুরু করেছে।

গাদি আইজেনকট জানিয়েছেন, তাঁর দলের পক্ষে নেসেটের নেতৃত্ব দেবেন নবনির্বাচিত আইনপ্রণেতা রয় ফোকম্যান। তিনি ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত কুলানু পার্টির আইনপ্রণেতা ছিলেন এবং সে সময় দলটির পার্লামেন্টারি গ্রুপের প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

আইজেনকট ফোকম্যানের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, বিশ্লেষণী দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও নেতৃত্বের প্রশংসা করেছেন।

অন্যদিকে বি’ইয়াচাদ দলের নেতা নাফতালি বেনেট তাঁর দলের পার্লামেন্টারি গ্রুপের প্রধান হিসেবে আইনপ্রণেতা ইতান গিন্সবার্গকে নিয়োগ দিয়েছেন। আর্জেন্টিনায় জন্ম নেওয়া গিন্সবার্গ আগের পার্লামেন্টে ব্লু অ্যান্ড হোয়াইট দলের সদস্য ছিলেন। তিনি নেসেটের বিভিন্ন কমিটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২১ সালে নেতানিয়াহু-গান্টজ সরকার ভেঙে যাওয়ার আগে প্রায় ছয় সপ্তাহের জন্য যোগাযোগমন্ত্রীও ছিলেন তিনি।

সূত্র: টাইমস অব ইসরায়েল