মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে হামলার শঙ্কা, কাতারে ইরানি প্রতিনিধিদের বৈঠক

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে নতুন করে হামলা চালানোর আশঙ্কার মধ্যে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধের অবসানের পথ খুঁজতে কাতারের মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ইরানি প্রতিনিধিরা। শনিবার (৩১ অক্টোবর) কাতারের রাজধানী দোহায় এ আলোচনা হয়। এর আগে শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) তেহরানে ইরানি ও কাতারি প্রতিনিধিদের মধ্যে ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে বৈঠক হয়েছিল বলে আলোচনার বিষয়ে অবগত একটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে। সূত্রটি বলেছে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে এসব আলোচনা সমন্বয় করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও শনিবার (৩১ অক্টোবর) বলেছেন, ইরানে নতুন করে হামলা চালানোর বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত নেননি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে তিনি কূটনৈতিকভাবে সংঘাতের সমাধান চান। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের উভয় কক্ষে রিপাবলিকান পার্টি তাদের সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারবে কি না, তা নির্ধারণ করবে এ সপ্তাহের মধ্যবর্তী নির্বাচন। নির্বাচনের আগে কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরানে হামলা চালানো থেকে বিরত রয়েছেন ট্রাম্প। তবে আঞ্চলিক দেশগুলো আশঙ্কা করছে, ভোট শেষ হলে তিনি আবারও হামলা শুরু করতে পারেন।

ইরান বারবার জানিয়েছে, দেশটির ওপর নতুন করে হামলা হলে প্রতিবেশী দেশগুলোতে থাকা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা আঘাত হানা হবে। এমন পরিস্থিতিতে শনিবার ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি সশস্ত্র বাহিনীকে যেকোনো হামলার তাৎক্ষণিক জবাব দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। পরে ইরানের সামরিক বাহিনীও নিজেদের প্রস্তুতি বাড়াতে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানায়।

খামেনি তাঁর সরকারি টেলিগ্রাম অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত বিবৃতিতে বলেন, যেকোনো মাত্রা বা ধরনের হুমকির জবাব দিতে হবে তাৎক্ষণিকভাবে, কার্যকরভাবে এবং ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা ছাড়াই। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, জ্যেষ্ঠ সামরিক কমান্ডাররা উপসাগরীয় উপকূল, হরমুজ প্রণালি ও ওমান উপসাগর এবং ইরানের উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে উচ্চমাত্রার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন। বাবার মৃত্যুর পর সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব নেওয়া মোজতবা খামেনিকে এরপর থেকে জনসমক্ষে দেখা যায়নি।

এদিকে ইরানের প্রভাবশালী নিরাপত্তাপ্রধান মোহসেন রেজাই বলেছেন, নতুন করে সংঘাত শুরু হলে পারমাণবিক অস্ত্রের ওপর দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে তেহরানে আলোচনা চলছে। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তিনি আরও বলেছেন, ওয়াশিংটন ইরানের দাবিগুলো মেনে না নিলে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কোনো আলোচনা হতে পারে না।

আটলান্টায় জি-২০ জোটের সদস্য দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠকে থাকা রুবিও কাতারে চলমান আলোচনার কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা জানাননি। তবে তিনি বলেছেন, ইরানের সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষ যোগাযোগ চলছে। তাঁর ভাষায়, আলোচনা কখনোই পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ট্রাম্প কূটনৈতিক সমাধানকে অগ্রাধিকার দিলেও প্রয়োজন হলে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে বলে মন্তব্য করেন রুবিও।

গত ফেব্রুয়ারিতে ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন ট্রাম্প। এরপর থেকে তিনি একাধিকবার নতুন করে হামলা শুরুর ইঙ্গিত দিয়েছেন। গত সপ্তাহে ইসরায়েলিদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে তিনি তাঁর যুদ্ধকালীন মিত্র প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ক্ষমতায় রাখার আহ্বান জানান, যাতে দুই নেতা মিলে কাজটি শেষ করতে পারেন।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে ওয়াশিংটন কূটনৈতিক আলোচনার পথ খোলা রাখারও ইঙ্গিত দিয়েছে। চলতি সপ্তাহের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান রেজাইকে একটি চিঠি লেখেন। নিউইয়র্ক টাইমস ও ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের সঙ্গে আলোচনা আবার শুরু করা সম্ভব কি না, তা যাচাই করতেই চিঠিটি পাঠানো হয়েছিল। তবে ট্রাম্প চিঠিটির গুরুত্ব কমিয়ে দেখিয়ে বলেছেন, ইরানে আরও চিকিৎসাসামগ্রী প্রবেশের সুযোগ নিয়ে আলোচনার জন্যই তিনি এতে সম্মতি দিয়েছিলেন।

আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, কাতারের প্রতিনিধিরা এক সপ্তাহ আগে তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আস্থা তৈরির জন্য সাত দিনের একটি প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছিলেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, বৃহত্তর শান্তি আলোচনা শুরুর আগে দুই দেশ প্রতিদিন আস্থা তৈরির লক্ষ্যে পদক্ষেপ নেবে। তবে শুক্রবার এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, তেহরান প্রস্তাবটিকে সন্তোষজনক বলে মনে করেনি।

অন্যদিকে, সেপ্টেম্বর থেকে ইরানও নিজেদের সাত দিনের একটি পরিকল্পনা প্রস্তাব করে আসছে, যা এখন পর্যন্ত ট্রাম্প প্রত্যাখ্যান করেছেন। ইরানের পরিকল্পনায় দেশটির বন্দরগুলোর ওপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ তুলে নেওয়া, জব্দ করা সম্পদ অবমুক্ত করা এবং ইরান-সমর্থিত একটি পথের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের অনুমোদন দেওয়ার কথা রয়েছে। এসব পদক্ষেপের পর বিতর্কিত প্রণালিটি আবার খুলে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে তেহরান।

শনিবার আল জাজিরার বরাতে প্রকাশিত বক্তব্যে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, ভ্যান্সের চিঠিটি পর্যালোচনা করছে তেহরান। হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে ইরানের নিজস্ব পরিকল্পনাকেই একমাত্র প্রস্তাব হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। সূত্র: আরব নিউজ