স্পিডবোট থেকে ক্ষেপণাস্ত্রবাহী যুদ্ধযান, বদলে গেছে ইরানের নৌবহর

চার দশকে ইরানের দ্রুতগতির আক্রমণকারী নৌযানের সক্ষমতায় বড় পরিবর্তন এসেছে। একসময় মেশিনগান ও রকেট লঞ্চারসজ্জিত হালকা স্পিডবোট হিসেবে ব্যবহৃত এসব নৌযান এখন জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, টর্পেডো, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং চালকবিহীন প্রযুক্তিসম্পন্ন সামরিক প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। উন্নত নৌকাঠামো, শক্তিশালী ইঞ্জিন ও দেশীয় প্রযুক্তির সমন্বয়ে পারস্য উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের নৌ-সক্ষমতা বাড়িয়েছে তেহরান।

ইরানের সংবাদমাধ্যম ওয়ানা নিউজ এজেন্সির এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, দেশটির নতুন কিছু দ্রুতগতির নৌযানের সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ২০০ কিলোমিটারেরও বেশি। আকারে তুলনামূলক ছোট হলেও এসব নৌযানে যুক্ত হয়েছে বিভিন্ন ধরনের আক্রমণ ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। ফলে এগুলো কেবল টহল বা উপকূলীয় নিরাপত্তার কাজে সীমাবদ্ধ নেই, বরং ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ও সামরিক অভিযানেরও অংশ হয়ে উঠেছে।

প্রতিবেদনে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মোজতবা হোসেইনি খামেনির একটি বক্তব্যেরও উল্লেখ করা হয়েছে। পবিত্র প্রতিরক্ষা সপ্তাহ এবং সাইয়্যেদ হাসান নাসরাল্লাহ হত্যার দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে দেওয়া বার্তায় তিনি দক্ষিণাঞ্চলীয় জলসীমায় শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তনের কথা বলেন। তার দাবি, একসময় এসব জলসীমায় প্রতিপক্ষের আধিপত্য থাকলেও বর্তমানে ইরানি যোদ্ধা ও হরমুজ প্রণালির প্রতিরক্ষাকারীদের আঘাতে আগ্রাসীরা পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে। ওয়ানার প্রতিবেদনে এই বক্তব্যকে ইরানের নৌ ও প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

প্রাথমিক প্রজন্ম থেকে ক্ষেপণাস্ত্রবাহী নৌযান

রানের দ্রুতগতির আক্রমণকারী নৌযানের প্রাথমিক পর্যায়ের একটি হলো আজারাখশ।
আজারাখশপ্রায় ২৩ মিটার দীর্ঘ এই নৌযানটি বাহমান-১ পরিবারের অন্তর্ভুক্ত এবং এর কাঠামো ক্যাটামারান ধরনের। প্রায় ২০ টন ওজনের নৌযানটি ডিজেল ইঞ্জিনে চলে। এর সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় প্রায় ৯৩ কিলোমিটার এবং কার্যকর পাল্লা প্রায় ৫০০ কিলোমিটার। অস্ত্র হিসেবে এতে রয়েছে ২৩ মিলিমিটারের কামান, ১২ দশমিক ৭ মিলিমিটারের মেশিনগান, ১৬ নলবিশিষ্ট ১০৭ মিলিমিটারের রকেট লঞ্চার এবং প্রায় ৩০ কিলোমিটার পাল্লার সামুদ্রিক নজরদারি রাডার।

আশুরা পরিবারের নৌযানগুলো তৈরি করা হয়েছে টহল, সেনা পরিবহন ও যুদ্ধের কাজে ব্যবহারের জন্য। এর আশুরা-৩৩ মডেলটি ১০ মিটার দীর্ঘ এবং ২ দশমিক ৭ মিটার প্রশস্ত। দুটি ৩৫০ অশ্বশক্তির ইঞ্জিনে চলা এই নৌযান ঘণ্টায় প্রায় ১০২ কিলোমিটার গতিতে চলতে পারে এবং আটজন সদস্য বহন করতে সক্ষম। এতে রয়েছে ১১ নলবিশিষ্ট ১০৭ মিলিমিটারের রকেট লঞ্চার, ১২ দশমিক ৭ মিলিমিটারের মেশিনগান ও সামুদ্রিক রাডার। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে কাওসার ক্ষেপণাস্ত্রসজ্জিত পাঁচটি আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার আশুরা নৌযান, টর্পেডোবাহী পাঁচটি নৌযান এবং কার্বন ফাইবারের কাঠামোযুক্ত দুটি কমান্ড নৌযান ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নৌবহরে যুক্ত হয়।

২০১০ সালে সামনে আনা সেরাজ-১ তৈরি করা হয়েছিল উচ্চগতির ব্লেডরানার নৌযানের নকশার ভিত্তিতে। এতে ফাইবারগ্লাসের কাঠামো, দেশীয় যোগাযোগ সরঞ্জাম ও ইলেকট্রনিক নেভিগেশন ব্যবস্থা রয়েছে। এর গতি ঘণ্টায় প্রায় ১১১ কিলোমিটার। পরবর্তী সংস্করণগুলোর গতি ঘণ্টায় ৭০ নটিক্যাল মাইলের বেশি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সেরাজ-১-এ রয়েছে ১১ নলবিশিষ্ট ১০৭ মিলিমিটারের রকেট লঞ্চার, সামনের দিকে স্থাপিত ১২ দশমিক ৭ মিলিমিটারের মেশিনগান এবং প্রায় ৩০ কিলোমিটার পাল্লার সামুদ্রিক নজরদারি রাডার।

ক্ষেপণাস্ত্র, টর্পেডো ও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা

ইরানের দ্রুতগতির নৌযানকে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের প্ল্যাটফর্মে রূপান্তরের ক্ষেত্রে জুলফাগার পরিবারকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে তুলে ধরেছে ওয়ানা। ১৬ মিটার দীর্ঘ ও প্রায় ১৪ টন ওজনের এই নৌযান দুটি ডিজেল ইঞ্জিনে চলে। এর সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় প্রায় ৯৬ কিলোমিটার এবং পাল্লা প্রায় ৩২০ নটিক্যাল মাইল। এতে ২৫ কিলোমিটার পাল্লার কাওসার জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, দুটি ১২ দশমিক ৭ মিলিমিটারের মেশিনগান এবং সামুদ্রিক নজরদারি রাডার রয়েছে।

জুলফাগার

জুলফাগারের উন্নত সংস্করণে যুক্ত করা হয়েছে নাভাব উল্লম্ব উৎক্ষেপণব্যবস্থা, যাতে চারটি ক্ষেপণাস্ত্র বহন করা যায়। ২০২৩ সালের মে মাসে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলিরেজা তাংসিরি জানান, ঘণ্টায় প্রায় ১০২ কিলোমিটার গতিতে চলতে সক্ষম ১৬ মিটার দীর্ঘ একটি নৌযানে এই ব্যবস্থা স্থাপন ও পরীক্ষা করা হয়েছে। এ ছাড়া হালকা নৌযানের জন্য পাঁচ থেকে সাত কিলোমিটার পাল্লার কাওসার-২০০ এবং ১৭ কিলোমিটার পাল্লার কাওসার-২২২ ক্ষেপণাস্ত্রও তৈরি করা হয়েছে।

টর্পেডো উৎক্ষেপণের জন্য তৈরি করা হয়েছে জোলজানাহ নামের আরেকটি দ্রুতগতির নৌযান। ১৬ দশমিক ৩ মিটার দীর্ঘ এই নৌযান দুটি ১ হাজার ২০০ অশ্বশক্তির ইঞ্জিনে চলে। এর সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় প্রায় ৯৬ কিলোমিটার এবং পাল্লা ৩২০ নটিক্যাল মাইল। এতে ১২ দশমিক ৭ ও ২৩ মিলিমিটারের মেশিনগান, ১০৭ ও ১২২ মিলিমিটারের রকেট এবং টর্পেডো উৎক্ষেপণের সরঞ্জাম রয়েছে।

অন্যদিকে রেজভান নৌযানটি ক্যাটামারান নকশায় তৈরি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকারী প্ল্যাটফর্ম। ১৬ মিটার দীর্ঘ এই নৌযানে দুটি ১ হাজার ৩০০ অশ্বশক্তির ইঞ্জিন রয়েছে। এর সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় প্রায় ৮৩ কিলোমিটার। এতে দুটি জাহাজবিধ্বংসী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণব্যবস্থা, ২৩ মিলিমিটারের কামান এবং দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি সামুদ্রিক রাডার যুক্ত করা হয়েছে। ২০২০ সালের জুনে এ ধরনের চারটি নৌযান ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নৌবহরে যুক্ত হয়।

তারেক নামের আরেকটি নৌযান শুরুতে রকেট উৎক্ষেপণব্যবস্থা নিয়ে তৈরি করা হলেও পরে এতে ভূপৃষ্ঠ থেকে ভূপৃষ্ঠে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র যুক্ত করা হয়। এর পাল্লা প্রায় ১৮০ কিলোমিটার। উন্নত সংস্করণের একটি ক্ষেপণাস্ত্রবাহী তারেক ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নৌবহরে যুক্ত হয়।

চালকবিহীন ও অতি দ্রুতগতির নৌযান

দূরনিয়ন্ত্রিত নৌযান তৈরির ক্ষেত্রেও অগ্রগতির কথা জানিয়েছে ইরান। ইয়্যা মাহদি নামের নৌযানটিতে রয়েছে যৌগিক উপাদানে তৈরি কাঠামো, দুটি ৬৬০ অশ্বশক্তির ইঞ্জিন, তিনটি রকেট উৎক্ষেপণ অবস্থান, ইলেকট্রনিক সেন্সর এবং দূরনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। এর সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় প্রায় ৯৩ কিলোমিটার।

২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি সামনে আনা হায়দার-১১০ নৌযানটি ক্যাটামারান নকশায় তৈরি। ১৪ মিটার দীর্ঘ এই নৌযানটির সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় প্রায় ২০৪ কিলোমিটার বলে জানিয়েছেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তাংসিরি। এর পাল্লা প্রায় ৬৫০ কিলোমিটার এবং এতে ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তৈরি দুটি মাঝারি পাল্লার জাহাজবিধ্বংসী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র বহন করা যায়।

হায়দার ১১০

এ ছাড়া ২০২৬ সালের ৩০ মে তেহরানের এনগেলাব স্কয়ারে জনসমাবেশের ৯০তম রাত উপলক্ষে ২৭ রজব নামের একটি আক্রমণকারী নৌযান উন্মোচন করা হয়। তিনটি কাঠামো বা ট্রাইমারান নকশায় তৈরি এই নৌযানে একটি কেন্দ্রীয় ও দুটি পার্শ্বীয় অংশ রয়েছে। ঢেউয়ের মধ্যে স্থিতিশীলতা ও কার্যক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যেই এ নকশা ব্যবহার করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নৌযানটি ৭০০ কিলোমিটার পাল্লার দুটি সমুদ্রভিত্তিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র বহন ও উৎক্ষেপণ করতে পারে। তিন মিটার উচ্চতার ঢেউয়েও এটি চলতে সক্ষম বলে উন্মোচনের সময় জানানো হয়েছিল।

নৌবহরের সম্প্রসারণ

শুধু নতুন মডেলের নৌযান তৈরি নয়, বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নৌবহর সম্প্রসারণেও ধারাবাহিক উদ্যোগ নিয়েছে ইরান। ২০২০ সালের জুনে ১১২টি নৌযান ও সামুদ্রিক সরঞ্জাম নৌবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। একই বছরের ডিসেম্বরে যুক্ত হয় আরও ৩৪০টি নৌযান।

২০২৩ সালের ডিসেম্বরে নৌবহরে যুক্ত করা হয় ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকারী জুলফাগার, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও টর্পেডোসজ্জিত আশুরা, উন্নত ক্ষেপণাস্ত্রবাহী তারেক এবং নয়টি মারসাদ যুদ্ধ ও নজরদারি নৌযান। এর ফলে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ, টর্পেডো বহন, আকাশ প্রতিরক্ষা এবং চালকবিহীন প্রযুক্তি, বিভিন্ন সক্ষমতার নৌযান নিয়ে একটি বৈচিত্র্যময় বহর গড়ে উঠেছে।

ওয়ানার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, উপকূলভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও নজরদারি ব্যবস্থার সঙ্গে এসব দ্রুতগতির নৌযান ইরানের সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গতি, আক্রমণক্ষমতা, দ্রুত অবস্থান পরিবর্তন এবং দেশীয় প্রযুক্তির সমন্বয় পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নৌ-সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে এসব নৌযানের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। তবে প্রতিবেদনে উল্লেখিত নৌযানগুলোর গতি, পাল্লা ও অস্ত্রসজ্জার তথ্য মূলত ইরানি সূত্রের দেওয়া বিবরণের ওপর নির্ভরশীল। সূত্র: ওয়ানা নিউজ